সিগারেট কোম্পানির বেপরোয়া আইনভঙ্গ, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বাস্তবায়ন কমেছে

 আতিকুর রহমান, ক্রাইম রিপোর্টারঃ-

দেশজুড়ে বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে সিগারেট কোম্পানিগুলো পরিকল্পিতভাবে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন করছে। বিশেষ করে দুটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানি এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আইন ভঙ্গ করছে বলে উঠে এসেছে এক গবেষণায়। একই সঙ্গে আইন বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর দুর্বলতা ও নজরদারির ঘাটতির কারণেই দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের হার আগের বছরের তুলনায় কমে এসেছে বলে জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের ৮টি বিভাগীয় শহরে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরে টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি), ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছরে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর মধ্যে খুলনায় ১৯ শতাংশ, রংপুরে ১৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ১১ শতাংশ, ঢাকা ও সিলেটে ১০ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়নে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ সংক্রান্ত সাইনেজের অভাব, প্রকাশ্যে ধূমপানের প্রবণতা, বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড প্রচারণা ও দৃশ্যমান প্রদর্শন এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাক বিক্রির মতো ঘটনা আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতাকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, নিয়মিত তদারকি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের (বাটা) ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী ও প্রত্যাশা মাদকবিরোধী সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হেলাল আহমেদ। প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ) শেখ মোমেনা মনি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক মো. আখতারউজ-জামান। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, স্বাস্থ্য বিভাগ, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও তামাকবিরোধী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

টিসিআরসির সদস্য সচিব ও প্রকল্প পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর রহমানের সঞ্চালনায় গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্প সমন্বয়কারী ফারহানা জামান লিজা।

তিনি জানান, পর্যবেক্ষণ করা পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনের মাত্র ২১ শতাংশ ধূমপানমুক্ত হিসেবে চিহ্নিত ছিল। যেখানে সাইনেজ পাওয়া গেছে, তারও মাত্র ৫২ শতাংশ আইন অনুযায়ী স্থাপন করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণকৃত ৩৬ শতাংশ স্থানে প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখা গেছে এবং ৪৮ শতাংশ স্থানে সিগারেট বা বিড়ির অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে, যা ধূমপানের উপস্থিতির স্পষ্ট প্রমাণ। এছাড়া ১৬ শতাংশ পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনের ভেতরে তামাকজাত পণ্যের বিক্রয়কেন্দ্র পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৮৩ শতাংশ ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন, প্রচার ও প্রদর্শনসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে।

গবেষণাটি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের শহরে পরিচালিত হয়। এতে ৭০০টি পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহন এবং ৮১৯টি তামাকজাত পণ্যের বিক্রয়কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা হয়।

গবেষণার ফলাফলে আরও দেখা যায়, ৭৮ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন রয়েছে। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড প্রচারণা, ৬৮ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডিং সামগ্রী ব্যবহার, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে দৃশ্যমানভাবে তামাকজাত পণ্য প্রদর্শন, ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রে নতুন ব্র্যান্ড বা পণ্যের প্রচারণা, ৬৭ শতাংশ ক্ষেত্রে মূল্যভিত্তিক প্রচারণা এবং ৭৬ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে তামাক কোম্পানির ব্র্যান্ডযুক্ত সাইনবোর্ড ব্যবহার করা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, বিক্রয়কেন্দ্রগুলো এখনও তামাক কোম্পানিগুলোর অন্যতম প্রধান বিপণন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাক বিক্রির ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে গবেষণায়। এতে দেখা গেছে, ২১ শতাংশ ক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিদের কাছে তামাকজাত পণ্য বিক্রি করা হয়েছে। এছাড়া ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের দিয়েই তামাকজাত পণ্য বিক্রি করানো হয়েছে। গবেষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ, বিক্রেতাদের সচেতনতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

গবেষণায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সব পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে আইন অনুযায়ী ধূমপান নিষিদ্ধ সাইনেজ নিশ্চিত করা, নিয়মিত মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা জোরদার করা, বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত পণ্যের দৃশ্যমান প্রদর্শন, ব্র্যান্ডিং ও পরোক্ষ বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাক বিক্রি বন্ধে কার্যকর নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সিভিল সোসাইটির সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ মোমেনা মনি বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে নিয়ে শিগগিরই একটি কার্যকর সমন্বয় সভা আয়োজন করবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। তিনি জানান, আগামী এক মাসের মধ্যে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের অনলাইন মনিটরিং সিস্টেম চালু করা হবে।

পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রি বন্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনারও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, নিয়মিত তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন গবেষক ও সংশ্লিষ্টরা।