ফ্যাসিবাদের মহর: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বৈধতার সংকট এডভোকেট আব্দুল আলিম, সদস্য সচিব, জেডিপি

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিজেকে ঐতিহাসিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী ও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে তুলে ধরে এসেছে। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দল ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা কর্মসূচি এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল—এই ইতিহাস অস্বীকারের সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, দলটি কি তার এই ঐতিহাসিক অর্জনকে পরবর্তীকালে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার একরকম নৈতিক লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছে?

২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছিল—ভোটার উপস্থিতি, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন আসন এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে পর্যবেক্ষক মহল বারবার সমালোচনা করেছে। সমালোচকদের ভাষ্যে, এই নির্বাচনগুলো প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের বদলে ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। এর পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ, বিরোধী মতের কণ্ঠরোধ এবং বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের উপর দলীয়করণের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের আলোচনায় এসেছে। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ভীতির পরিবেশ তৈরির অভিযোগও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বহুবার তুলে ধরেছে।

এই দীর্ঘ প্রবণতার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে। ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে এবং যার পরিণতিতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান, তা অনেকের চোখে পূর্ববর্তী সব অভিযোগের একটি চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে এই আখ্যান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, এবং নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলীয় নেতাদের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। ২০২৬ সালের জুনে সংসদ সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল পাস করে এই নিষেধাজ্ঞাকে আইনি ভিত্তি দিয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারছে না।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তি দেওয়া হয়, “স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি” হিসেবে দলটির ঐতিহাসিক পরিচয় এবং তার শাসনামলের কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি স্থায়ী বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে, যা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের রায়ে সিলমোহর পেয়েছে। এই যুক্তির সমর্থকদের মতে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন কাঠামোয় দলটির পুনর্বাসন বা “গণতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ” হিসেবে প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা রাজনৈতিকভাবে ফুরিয়ে গেছে।

তবে এই আখ্যানের বিপরীতে উল্লেখযোগ্য যুক্তিও রয়েছে। আওয়ামী লীগের আইনজীবী ও সমর্থকরা প্রশ্ন তোলেন, একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্বাহী আদেশে বিচার শেষ হওয়ার আগেই গোটা একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা নিজেই গণতান্ত্রিক নীতিমালার লঙ্ঘন কিনা। কিছু সমালোচক এই পদক্ষেপকে আইনি প্রক্রিয়ার বদলে নির্বাহী ফরমানের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল ধ্বংসের প্রচেষ্টা হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাংশের যুক্তি, ব্যক্তি অপরাধীর বিচারের পরিবর্তে গোটা দলকে নিষিদ্ধ করে লাখো সমর্থককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা একটি ভিন্নমাত্রার সমস্যা তৈরি করে। আবার কিছু বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো ও সাংগঠনিকভাবে বৃহৎ ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তিকে অঙ্গন থেকে সম্পূর্ণ অপসারণ করলে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা দীর্ঘমেয়াদে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি বহন করতে পারে।

আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও পরবর্তী শাসনামলের রেকর্ড নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্ক গভীরভাবে বিভাজিত এবং এখনও চলমান। নির্বাচন, বিচার প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই আখ্যান এখনও রূপ নিচ্ছে। যেকোনো চূড়ান্ত রায় দেওয়ার আগে উভয় পক্ষের যুক্তি ও আসন্ন নির্বাচন-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনায় রাখা জরুরি।