প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬
সময়: ০৩:২৩ পিএম
মামলা-গ্রেপ্তারের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের সংকট
এস আই খান:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মামলা ও গ্রেপ্তার নতুন কোনো ঘটনা নয়। বরং ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, রিমান্ড, কারাবন্দি করা এবং দীর্ঘদিন বিচার না হওয়ার অভিযোগ যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে উঠেছে। এক সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে যে কৌশল ব্যবহার করেছে, পরবর্তী সরকার বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উঠতে দেখা গেছে। ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু—কে গ্রেপ্তার হলো? বরং বড় প্রশ্ন হলো, আইন কি সবার জন্য সমান, নাকি রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী আইনের প্রয়োগও বদলে যায়?
২৩ আগস্ট বেলাবোতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সহ-সভাপতি মো. এহসান উল্লাহ পিয়ালকে গ্রেপ্তারের ঘটনা এই পুরোনো সংকটকেই নতুন করে সামনে এনেছে। পুলিশ বলছে, ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বেলাবো থানায় দায়ের করা একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং মামলাটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একাধিক ধারায় করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের এখতিয়ার আদালতের; তাই গ্রেপ্তার হওয়া মানেই কেউ অপরাধী—এমন ধারণা আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সন্ত্রাসবিরোধী আইন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনগণের জীবন রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন। সন্ত্রাস, সহিংসতা, নাশকতা কিংবা সংগঠিত অপরাধ দমনে রাষ্ট্রকে কার্যকর আইন অবশ্যই দিতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে এই আইনের প্রয়োগ হতে হবে অত্যন্ত সতর্ক, নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর। কারণ, সাধারণ ফৌজদারি মামলার তুলনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অভিযোগের সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত অনেক বেশি। এই আইন যদি প্রকৃত সন্ত্রাস দমনের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে দমন করার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তি নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস এই আশঙ্কাকে একেবারে অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ দেয় না। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সংগঠনটি বলেছে, রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গ্রেপ্তার ও মামলার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে সংকুচিত করা হয়েছিল।
শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক শক্তির ইতিহাসেই মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবাস কিংবা রাজনৈতিক হয়রানির অধ্যায় আছে। বিএনপির ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতো শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময়ে মামলা, গ্রেপ্তার বা কারাবাসের মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের রাজনৈতিক সহিংসতার পর মির্জা ফখরুল, মির্জা আব্বাস ও আমীর খসরুসহ বিএনপির বহু নেতার বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ব্যাপক আলোচিত হয়। মির্জা ফখরুলকে ওই সময় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও পালাবদলের পর চিত্রটি উল্টে গেছে। শেখ হাসিনা, সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন যিনি হাতকড়া পরে কবরবাসী হয়েছেন, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, জুনাইদ আহমেদ পলক, হাজী মোহাম্মদ সেলিম, আবদুস সোবহান গোলাপ, এ কে এম সারওয়ার জাহান বাদশাসহ আওয়ামী লীগ ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে ২০২৪-পরবর্তী মামলায় গ্রেপ্তার বা কারাবন্দি হয়েছেন। ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ঢাকায় জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৭০৭টি মামলা এবং ৫,০৭৯ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পুলিশ ও সরকারি সংবাদ সংস্থা প্রকাশ করেছে; এসব মামলায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা আসামি হয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক মামলার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমানকে ২০২২ সালে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং তিনি প্রায় ১৫ মাস কারাগারে ছিলেন—পরবর্তী সময়ে তিনি জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী নেতা হিসেবে সামনে আসেন। অতীতে জামায়াতের আমির গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দণ্ডের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তবে যুদ্ধাপরাধের বিচারসংক্রান্ত অপরাধ ও সাধারণ রাজনৈতিক হয়রানিকে এক করে দেখা উচিত নয়; প্রতিটি মামলার অভিযোগ, প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়া আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
জাতীয় পার্টিও এই রাজনৈতিক মামলা-গ্রেপ্তারের সংস্কৃতির বাইরে নয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা ছাড়ার পর গ্রেপ্তার ও কারাবাসের মুখোমুখি হন। পরবর্তী সময়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরও মামলা ও আইনি হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন; ২০২৫ সালে তিনি প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন যে তাকে রাজনৈতিকভাবে চুপ করিয়ে দিতে দুর্নীতি ও হত্যা মামলা করা হয়েছে। অভিযোগটি তার রাজনৈতিক বক্তব্য—মামলার সত্যতা অবশ্যই আদালত ও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর মতো আওয়ামী লীগ-জোটভুক্ত বামপন্থী নেতারাও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর গ্রেপ্তার হয়েছেন। মেননকে ২২ আগস্ট ২০২৪ এবং ইনুকে ২৬ আগস্ট ২০২৪ গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়।
এখানে একটি ভয়ংকর ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়—ক্ষমতায় থাকলে মামলা হয় বিরোধীদের বিরুদ্ধে, আর ক্ষমতা হারালে সেই মামলার আসামি হয়ে যায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলো সরকার পরিবর্তন করে, কিন্তু মামলা-নির্ভর রাজনীতির সংস্কৃতি পরিবর্তন হয় না। ২০২৪ সালের পর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ২০২৩-২৪ সালে বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা ও গ্রেপ্তার—দুই সময়ের ঘটনাই দেখায়, দল বদলালেও প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির কাঠামো টিকে থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন পর্যবেক্ষণেও নির্বিচার গ্রেপ্তার, অজ্ঞাতনামা আসামি এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মামলা ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের পরের ঘটনাপ্রবাহ এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুলিশ ৯২,৪৮৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে, যার অধিকাংশই হত্যা-সংক্রান্ত; এসব মামলায় বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়। একই সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের গোপালগঞ্জের সহিংসতার পর ৮,৪০০-এর বেশি মানুষের বিরুদ্ধে ১০টি হত্যা মামলা করা হয়, যাদের অধিকাংশই ছিল অজ্ঞাতনামা।
এর আগে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর সময়ও ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে, ওই অভিযানে প্রায় ৮,৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার আটকের পুরোনো সংস্কৃতি পরবর্তী সময়েও অব্যাহত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মামলা যখন তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণের উপায় হয়ে ওঠে, তখন ‘আইনের শাসন’ ধীরে ধীরে ‘আইনের শাসনের নামে ক্ষমতার শাসনে’ পরিণত হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা অপরাধ করলে তাদের গ্রেপ্তার করা যাবে না। অবশ্যই যাবে। কোনো দলের পরিচয় কাউকে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল কিংবা অন্য যে কোনো সংগঠনের কোনো সদস্য হত্যা, সন্ত্রাস, নাশকতা, চাঁদাবাজি বা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনতেই হবে।
কিন্তু একই নীতির বিপরীত দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ—কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে অপরাধী বানানো যাবে না। এই পার্থক্যটিই গণতন্ত্রের মূল পরীক্ষা।
একজন রাজনৈতিক কর্মী গ্রেপ্তার হলেই তার অপরাধ প্রমাণিত হয় না। মামলা একটি অভিযোগ; আদালতের রায়ই অপরাধের চূড়ান্ত আইনি নির্ধারণ। তাই রাজনৈতিক মামলায় তদন্তের মান, সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামির ঘটনাস্থলে উপস্থিতি, মোবাইল/ডিজিটাল তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং তদন্ত কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা—সবকিছু যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামির সংখ্যা যখন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন সেটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্যও একটি সতর্ক সংকেত। কারণ, অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকা পরে যেকোনো রাজনৈতিক কর্মীকে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। অতীতে এমন মামলায় মৃত ব্যক্তি, বিদেশে অবস্থানকারী কিংবা ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা ব্যক্তির নামও যুক্ত হওয়ার অভিযোগ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো কঠোর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। ২০২৫ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ করেছিল যে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে এবং আইনটি শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক সংগঠনের অধিকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থাৎ সরকার বদলালেও যদি মামলা-গ্রেপ্তারের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাতে না পারে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোও রাজনৈতিক প্রতিশোধের চক্র থেকে বের হতে পারবে না।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিরোধী দল থাকবে, সমালোচনা থাকবে, মিছিল-মিটিং থাকবে, সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার থাকবে। আবার সরকারেরও দায়িত্ব থাকবে সহিংসতা, সন্ত্রাস ও নাশকতা দমন করা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলেই গণতন্ত্র দুর্বল হয়।
তাই পিয়ালের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে কোনো দলীয় আবেগ নয়, বরং একটি নীতিগত প্রশ্ন সামনে আসা দরকার—মামলাটি কি যথাযথ তদন্ত ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে? যদি প্রমাণ থাকে, আদালতে তা উপস্থাপন করতে হবে। আর যদি প্রমাণ না থাকে, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে দীর্ঘদিন কারাগারে আটকে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আজ ছাত্রলীগের একজন নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। কাল বিএনপির কোনো নেতা হতে পারেন, পরশু জাতীয় পার্টির, জামায়াতের কিংবা অন্য কোনো দলের নেতা। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে যদি শুধু আসামির তালিকা বদলায়, কিন্তু ব্যবস্থা একই থাকে, তাহলে সেটি গণতন্ত্রের বিজয় নয়—এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ধারাবাহিকতা।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি ‘কার লোক’ নয়, ‘কী প্রমাণ’—এই নীতিতে বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করা।
রাষ্ট্রের আইন হবে নির্দলীয়। পুলিশ হবে নিরপেক্ষ। তদন্ত হবে প্রমাণনির্ভর। আদালত হবে স্বাধীন। জামিন ও বিচারপ্রক্রিয়া হবে আইনের নির্ধারিত মানদণ্ডে। রাজনৈতিক মতাদর্শ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। যারা ক্ষমতায় গিয়ে বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাদেরও স্বীকার করতে হবে—এই সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের কাছেই ফিরে আসে। আজ যে আইন দিয়ে প্রতিপক্ষকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, কাল সেই একই আইন নিজের দলের কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মধ্যে নয়; বরং প্রতিপক্ষের অধিকার রক্ষা করেও নিজের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করার সক্ষমতার মধ্যে।
সুতরাং পিয়ালের গ্রেপ্তার আইনবিরোধী কি না, সেটি আদালত নির্ধারণ করবে। কিন্তু এই গ্রেপ্তার আমাদের সামনে যে বৃহত্তর প্রশ্নটি দাঁড় করিয়েছে, সেটি রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক—রাষ্ট্র কি অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ছে, নাকি রাজনৈতিক পরিচয়ের বিরুদ্ধে? এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকে শুধু পিয়ালের মামলায় নয়, প্রতিটি রাজনৈতিক মামলায় দিতে হবে।
কারণ গণতন্ত্রে ন্যায়বিচার তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন একই আইন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—দুই পক্ষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কারাগারে পাঠানো সহজ; কিন্তু এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণ করা কঠিন, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও আইনের চরিত্র পরিবর্তিত হয় না। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা এখন সেখানেই।