সরকারি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সরকারি গাড়ি নিয়ে ব্যক্তিগত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগ বেলাবো প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে
এস আই খান:
নরসিংদীর বেলাবো উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জুনায়েদ ইবনে হামিদ নাঈমের বিরুদ্ধে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে কর্মস্থলের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে পোল্ট্রি খামারিদের চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তার এ ধরনের কার্যক্রমকে সরকারি আচরণবিধির লঙ্ঘন হয়েছে বলে জানা গেছে।
ডা. জুনায়েদ ইবনে হামিদ নাঈম ২০২৪ সালের ৩ জুলাই বেলাবো উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে তিনি নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় কর্মরত ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, বেলাবো উপজেলায় সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি কর্মস্থলের বাইরে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে পোল্ট্রি খামারিদের চিকিৎসা ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এসব সেবার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি পৃথকভাবে প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও আর্থিক তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে গিয়ে শিবপুর উপজেলার দড়িপুরা পূর্বপাড়া মাস্টারবাড়ি এলাকার একটি মেডিসিনের দোকানে সরকারি গাড়িসহ ডা. জুনায়েদ ইবনে হামিদ নাঈমকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সেখানে পোল্ট্রি খামারিরা চিকিৎসা ও পরামর্শের জন্য তার কাছে এসেছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, বেলাব উপজেলার বাইরে শিবপুরের দড়িপুরা, ইটাখোলা এবং রায়পুরা উপজেলার মরজাল বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায়ও সরকারি গাড়ি নিয়ে গিয়ে তিনি খামারিদের চিকিৎসা ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
তবে এসব স্থানে তার প্রতিটি সফর ব্যক্তিগত কাজে ছিল কি না, তা সরকারি দায়িত্বের নথি ও গাড়ির লগবুক যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সরকারি সম্পদ ও যানবাহনের যথাযথ ব্যবহার এবং চাকরির আচরণবিধি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সরকারি আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রযোজ্য শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি যানবাহনের ব্যবহারসংক্রান্ত আইন ও বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে।
অন্যদিকে, সরকারি যানবাহনের ব্যবহারসংক্রান্ত বিধান লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রমাণিত হলে, সরকারি যানবাহন (ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৫-এর ধারা ৩(৩) অনুযায়ী বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শৃঙ্খলা আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এ ছাড়া, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ)-এ অসদাচরণের জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থার বিধান রয়েছে।
বিশেষ করে, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ১৭ অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীর সরকারি দায়িত্বের বাইরে অন্য ব্যবসা বা কাজে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে পূর্বানুমোদনের বিধান রয়েছে। ফলে, অনুমোদন ছাড়া সরকারি দায়িত্বের বাইরে অর্থের বিনিময়ে ব্যক্তিগত চিকিৎসা বা পরামর্শ দেওয়ার বিষয়টি ওই বিধির আলোকে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে কর্মস্থলের বাইরে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. জুনায়েদ ইবনে হামিদ নাঈম বলেন, “আমার জানামতে, এর ব্যবহারের বিধান রয়েছে।”
তবে কর্মস্থলের বাইরে সরকারি গাড়ি নিয়ে ব্যক্তিগত চিকিৎসা বা পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার কোনো দাপ্তরিক অনুমোদন রয়েছে কি না—এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
অভিযোগের বিষয়ে নরসিংদী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ছাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেননি।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) শাহজামান খান বলেন, সরকারি গাড়ি সরকারি কাজ ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কোনো কর্মকর্তা সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত কাজ বা ব্যক্তিগত সেবা দিয়ে থাকলে এবং এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় পোল্ট্রি খামারি ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, সরকারি গাড়িটি কোন কাজে, কখন এবং কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে, তা নির্ধারণে গাড়ির লগবুক, জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব, দাপ্তরিক আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কর্মস্থলের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা বা পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কোনো সরকারি দায়িত্ব বা অনুমোদন ছিল কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
সরকারি গাড়ি ও অন্যান্য সরকারি সম্পদের ব্যবহার জনগণের অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় বিষয়টি স্বচ্ছভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তবে অভিযোগের যেসব অংশ এখনো পৃথকভাবে যাচাই করা হয়নি—বিশেষ করে ব্যক্তিগত চিকিৎসাসেবার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ—সেগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সরকারি আচরণবিধি লঙ্ঘনের যে বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে, তার ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ কী ধরনের প্রশাসনিক বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।