প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
সময়: ০৪:৫৪ পিএম
যাত্রীসংকটে মুখ ফিরিয়েছে লঞ্চ, নিস্তব্ধ ভোলা খেয়াঘাট
আবু জাফর বিশ্বাস, বরিশাল ব্যুরোঃ
একসময় ভোলা শহরের ব্যস্ততম নৌযান টার্মিনাল ছিল ভোলা খেয়াঘাট। ভোলা-ঢাকা রুটের আটটি যাত্রীবাহী লঞ্চ নিয়মিত চলাচল করত এ ঘাট থেকে। যাত্রীদের পদচারণ, ঘাটশ্রমিকদের হাঁকডাক আর লঞ্চের ভেঁপুর শব্দে দিন-রাত মুখর থাকত পুরো এলাকা। সেই ঘাট এখন প্রায় প্রাণহীন। লঞ্চ নেই, যাত্রী নেই, নেই আগের ব্যস্ততাও।
যাত্রীসংকটের কারণে ভোলা-ঢাকা রুটের সর্বশেষ দুটি লঞ্চও গত ৫ জুলাই থেকে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে মালিকপক্ষ। ফলে বর্তমানে ভোলা খেয়াঘাটে কোনো যাত্রীবাহী লঞ্চ নোঙর করে না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যেখানে ছিল কর্মচাঞ্চল্য, সেখানে এখন বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা।
বর্তমানে সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের ইলিশা লঞ্চঘাট থেকে ভোলা-ঢাকাগামী যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করছে। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ওই ঘাটে লঞ্চের যাত্রী ওঠানামা করলেও ভোলা খেয়াঘাট পড়ে আছে অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায়।
সম্প্রতি সরেজমিনে ভোলা খেয়াঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটের টার্মিনালে কোনো যাত্রীবাহী লঞ্চ নেই। যাত্রীদেরও দেখা মিলছে না। ঘাটশ্রমিকদের সেই পরিচিত হাঁকডাক নেই। ফাঁকা পড়ে আছে ঘাটসংলগ্ন এলাকা।
বিআইডব্লিউটিএ, ঘাট ইজারাদার, শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্রিটিশ আমল থেকেই ভোলা সদর উপজেলার চরসামাইয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের চরশিফলী গ্রামের তেঁতুলিয়া নদীসংলগ্ন খালপাড়ে গড়ে ওঠে ভোলা খেয়াঘাট। ২০০৪ সালে বিআইডব্লিউটিএ ঘাটটিকে জেলার প্রথম ও একমাত্র লেবার হ্যান্ডেলিং পয়েন্ট হিসেবে ঘোষণা করে।
এরপর দীর্ঘদিন ধরে এ ঘাট দিয়ে ভোলার বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার মানুষ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করতেন। একসময় আটটি যাত্রীবাহী লঞ্চ নিয়মিত চলাচল করায় ঘাটটি ছিল জেলার গুরুত্বপূর্ণ নৌ যোগাযোগকেন্দ্র।
ঘাটশ্রমিক মো. জসিম বলেন, লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘাটের শ্রমিকদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় এখানকার শতাধিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী কাজের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছেন।
ঘাটের ইজারাদার মো. জাহাঙ্গীর আলম ও তাঁর ভাই খোকন জানান, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের ৩০ জুলাই পর্যন্ত এক বছরের জন্য ৫২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা দিয়ে তাঁরা ঘাটটি ইজারা নিয়েছেন। কিন্তু ইজারা নেওয়ার পর মাত্র পাঁচ দিন ভোলা-ঢাকা রুটে ‘এমভি আবে জমজম-৩’ ও ‘এমভি কর্ণফুলী-৯’ চলাচল করে। এরপর লঞ্চ দুটি বন্ধ হয়ে যায়।
ইজারাদারদের দাবি, লঞ্চ চলাচল বন্ধ হওয়ায় তাঁরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ অবস্থায় ইজারার টাকা ফেরত চেয়ে গত ১৭ জুলাই বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেছেন তাঁরা।
বিআইডব্লিউটিএ ভোলা নদীবন্দরের সহকারী পরিচালক নির্মল কুমার রায় বলেন, লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইজারাদার তাঁর ইজারার টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেছেন।
‘এমভি কর্ণফুলী-৯’ লঞ্চের ভোলার ব্যবস্থাপক মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘যাত্রীসংকটের কারণে আমাদের লোকসান হচ্ছে। তাই আপাতত ভোলা খেয়াঘাট থেকে ঢাকায় আমাদের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে।
একসময় জেলার নৌ যোগাযোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল যে ঘাট, সেখানে এখন লঞ্চ না থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। স্থানীয়দের মতে, নৌপথের পরিবর্তিত বাস্তবতা, যাত্রীদের বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা এবং ঘাটের অবস্থান—সব মিলিয়ে ভোলা খেয়াঘাট তার পুরোনো গুরুত্ব হারিয়েছে। দীর্ঘদিনের ব্যস্ত ঘাটটির ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটিই এখন স্থানীয়দের প্রশ্ন।