বেলাবো হাসপাতালে সেবার চিত্র বদলে দেওয়া RMO দেবাশীষ সাহার কারনবিহীন বদলি
বেলাবো (নরসিংদী) প্রতিনিধি:
নরসিংদীর বেলাবো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবার চিত্র বদলে দিতে একের পর এক উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালীন আবাসিক মেডিকেল অফিসার (RMO) ডা. দেবাশীষ সাহা। চিকিৎসক সংকট নিরসন, সিজারিয়ান অপারেশন বৃদ্ধি, প্যাথলজি পরীক্ষা, রক্ত সঞ্চালন, ২৪ ঘণ্টা ECG ও নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাম চালুর উদ্যোগে অল্প সময়ের মধ্যেই হাসপাতালটি রোগীদের আস্থার জায়গা হয়ে উঠতে শুরু করে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে তাকে বেলাবো থেকে বদলি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ডা. দেবাশীষ সাহা, পিতা বলাই চন্দ্র সাহা। তিনি নরসিংদীর স্বনামধন্য চিকিৎসক ক্যাপ্টেন (অব.) ডা. হেমেন্দ্র চন্দ্র সাহার নাতি। ২০১০ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার উঃ বাখরনগর ইউনিয়নে পোস্টিং পান। ২০১১ সালে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (RMO) হিসেবে যোগ দেন।
২০১২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে EOC (Emergency Obstetric Care) প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। ২০১৩ সালে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন ভবনে অপারেশন থিয়েটার (OT) কমপ্লেক্স নিজের তত্ত্বাবধানে সাজিয়ে নেন। রায়পুরা নরসিংদীর অন্যতম বড় উপজেলা হওয়ায় রোগীর চাপও ছিল বেশি। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, তার সময়ে সপ্তাহে ছয় দিন পর্যন্ত OT-তে সিজারিয়ান অপারেশন হতো।
২০১৬ সালের মে মাসে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে চিকিৎসা কর্মকর্তা হিসেবে কঙ্গোতে যান তিনি। সেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে প্রায় ১৭ মাস দায়িত্ব পালন করেন। মিশন শেষে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হৃদরোগ বিভাগে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেন। ২০২০ সালে মুগদা মেডিকেল কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপালের সুপারিশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবাসিক চিকিৎসক (R.P) হিসেবে পদায়ন করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
হাসপাতালসংশ্লিষ্ট সূত্র ও তৎকালীন RMO ডা. দেবাশীষ সাহার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেলাবো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট ছিল প্রকট। হাসপাতালটি মূলত SACMO-নির্ভর ছিল। ওই সময়ে মাসে সিজারিয়ান অপারেশনের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৭-৮টি। নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ECG সেবা চালু ছিল না। পাশাপাশি রিএজেন্ট সংকটের কারণে প্যাথলজি বিভাগে CBC ও Urine R/E ছাড়া অধিকাংশ পরীক্ষা করা সম্ভব হতো না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হতো।
হাসপাতালসংশ্লিষ্ট সূত্র ও তৎকালীন RMO ডা. দেবাশীষ সাহার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেলাবো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছিল মূলত SACMO-নির্ভর। ওই সময়ে মাসে সিজারিয়ান অপারেশন হতো আনুমানিক ৭-৮টি। নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ECG সেবা চালু ছিল না। রিএজেন্ট সংকটের কারণে CBC ও Urine R/E ছাড়া অধিকাংশ পরীক্ষা করা সম্ভব হতো না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হতো।
RMO হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডা. দেবাশীষ সাহা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে এক মাসের মধ্যে ছয়জন মেডিকেল অফিসারকে বেলাবো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পদায়নের ব্যবস্থা করেন বলে জানা যায়।
এরপর হাসপাতালের সেবার পরিধি বাড়াতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। ডা. দেবাশীষ সাহা নিজেই সপ্তাহে কয়েকটি সিজারিয়ান অপারেশনে অংশ নিতেন। প্যাথলজি বিভাগে প্রয়োজনীয় রিএজেন্টের ব্যবস্থা করে বিভিন্ন পরীক্ষা হাসপাতালেই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে রক্ত সঞ্চালন, ২৪ ঘণ্টা ECG এবং সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবা চালুর ব্যবস্থা করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তাছাড়া সরেজমিনে পাওয়া তথ্য অনুসার, তিনি সপ্তাহে ৫ দিন হাসপাতালের কোয়ার্টারে অবস্থান করে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতেন। এতে আবাসিক ডাক্তার হিসেবে তার সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
হাসপাতালের নিজস্ব সেবার পরিধি বাড়ার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়েও পরিবর্তন আসে বলে দাবি করেন সাবেক এই RMO। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে প্রায় ৭-৮ হাজার টাকা রাজস্ব খাতে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
শুধু হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সেবাই নয়, বহির্বিভাগেও রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন ডা. দেবাশীষ সাহা। তার দাবি, প্রতিদিন গড়ে ২৫-৩০ জন রেফারেল রোগী তিনি নিজে দেখতেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই স্থানীয় রোগীদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালের প্রতি আস্থা বাড়তে শুরু করে।
হাসপাতালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা বাড়ায় স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে রোগীর চাপ কমতে শুরু করেছিল বলেও দাবি রয়েছে। তবে এ দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
এদিকে ডা. দেবাশীষ সাহার দাবি, দায়িত্ব পালনের সময় তিনি কথিত ‘Physical Assault Certificate’ বাণিজ্যও বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার এসব উদ্যোগের কারণে তিনি নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েছিলেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
বেলাবো থেকে বদলির বিষয়ে ডা. দেবাশীষ সাহার বলেন, তার দেওয়া তথ্য ও কাজের বিবরণ কেউ ভুল প্রমাণ করতে পারলে তিনি যেকোনো শাস্তি মেনে নিতে প্রস্তুত। এমনকি আরও ছয় মাস সময় পেলে বেলাবো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে দেশের অন্যতম সেরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরিণত করা সম্ভব ছিল বলেও তিনি দাবি করেছিলেন।
ডা. দেবাশীষ সাহার কর্মজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল কোভিড-১৯ মহামারির সময়। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময়ে তৎকালীন হাসপাতাল পরিচালকের নির্দেশনায় তিনি নিয়মিত কোভিড আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা ও রাউন্ডে অংশ নিতেন বলে জানা যায়।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে দীর্ঘ সময় তার নিয়মিত ছুটি ছিল না। কোভিড পরিস্থিতিতে হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রম ও রোগীদের চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে গণমাধ্যমকে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং হাসপাতালের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
যে হাসপাতালটিতে চিকিৎসক সংকট, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা ও বিভিন্ন সেবা না থাকার অভিযোগ ছিল, সেখানে একসময় একাধিক সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সেই সেবাগুলোর কতগুলো চালু আছে, চিকিৎসক সংখ্যা কত, সিজারিয়ান, ECG, আল্ট্রাসনোগ্রাম, প্যাথলজি ও রক্ত সঞ্চালনসহ অন্যান্য সেবা কী অবস্থায় রয়েছে—তা সরেজমিনে পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ একজন কর্মকর্তার বদলি বা পদায়নকে কেন্দ্র করে বিতর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বেলাবো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগীরা বর্তমানে কতটা সরকারি চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন এবং যে সেবাগুলো একসময় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো কতটা টেকসই হয়েছে।