অর্ধশতাব্দী পুরোনো ভবন; ঊর্ধ্বমুখী নির্মাণে রাজউকের নিষেধাজ্ঞা

 

নিজস্ব প্রতিনিধি:

 

রাজধানীর পুরান ঢাকায় প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরোনো একটি লোড বেয়ারিং ওয়াল স্ট্রাকচার বিশিষ্ট ৩ তলা ভবনের ওপর অনুমোদনহীন ৪র্থ তলা নির্মাণকালে কাজ বন্ধের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ঘটনাটি রাজউক জোন-৫ এর আওতাধীন এবং পুরান ঢাকার লালবাগ থানাধীন আজিমপুর বটতলা এলাকার। যার হোল্ডিং নম্বর- ৩৮/১২ এবং বাড়িওয়ালা নাম মো. মনির। ৩ তলা ভবনটির মালিক মো. মনির হলেও, স্বীয় স্বার্থে তাকে তোষামোদে ফেলে এবং নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে এলাকার এক স্বার্থান্বেষী দম্পতি অবৈধভাবে ৪র্থ তলা নির্মাণের কাজটি করছিলেন বলে জানা যায়।

 

বহুতল ভবন নির্মাণে রাজউকের নিয়ম-নীতি মেনে চলা নগরবাসীর সুরক্ষা, সুপরিকল্পিত নগর এবং দীর্ঘস্থায়ী জীবনযাপনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। শহরের প্রতিটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন মেনে সুশৃঙ্খলভাবে ভবন নির্মাণ করা উচিত। রাজউকের অনুমতি না নিয়ে বা নকশা বহির্ভূতভাবে ভবন তুললে জরিমানা, জেল এমনকি ভবন ভেঙ্গে ফেলার আইনি বিধান রয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর নতুন আইন ও অধ্যাদেশ অনুযায়ী রাজউকের অনুমতি না নিয়ে বা অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদন্ড, ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দন্ডের আইনি বিধান রয়েছে। এর পরেও বিভিন্ন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও এক শ্রেণির অসাধু জমির মালিক অধিক মুনাফার লোভে রাজউকের বিধি-বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যা সরেজমিনে অহরহ দেখা মেলে।

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউক বর্তমানে অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে “জিরো টালারেন্স” নীতি বজায় রেখে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজিমপুরের বটতলা এলাকার উক্ত পুরোনো ৩ তলা ভবনের ওপর ৪র্থ তলা নির্মাণকাজ চলাকালীন গত ১৮ আগষ্ট (মঙ্গলবার) রাজউক থেকে সারপ্রাইজ ভিজিট করা হয়। ঘটনাস্থলে বাড়িটির মালিক মো. মনিরের দেখা না পেয়ে রাজউক অফিসার পুরাতন ৩ তলা ভবনে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ বিষয়ে মুঠোফোনে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি দূরে আছেন তাই এখন দেখা করা সম্ভব নয় বলে জানান। সাথে এটাও জানান যে, এই ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজের অনুমোদন রয়েছে তার কাছে। তখন রাজউক অফিসার সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রসহ মো. মনিরকে পরদিন অফিসে আসতে বলে নিয়মানুযায়ী মৌখিকভাবে আপতত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রদান করে চলে যান বলে জানা যায়। পরে অফিসে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়ে বাড়িওয়ালা মনির রাজউকের বিধি-নিষেধকে “থোরাই কেয়ার” করে রাতারাতি ৪র্থ তলার ছাদ ঢালাইয়ের উদ্দেশ্যে দ্রুত সাটারিং ও রড বাইন্ডিং এর কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।

 

এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায় যে, মো. মনিরের বাবা মৃত গোলাম মোস্তফা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এখানকার অনেকগুলো প্লটের মধ্য হতে ৩ কাঠার ১ টি প্লট ক্রয় করেন। এর আগে এখানে দেড় বিঘা জায়গার ওপরে একটি বিশাল পুকুর ছিল। ঐ সময় ময়লা-আবর্জনা এবং উপরের অংশে কিছু বালি-মাটি দিয়ে পুকুরটি ভরাট করে ২/৩ কাঠার প্লট আকারে বিক্রি করা হয়। এর কিছুদিন পর ১৯৭৭ সালে কোনো রকম পাইলিং ও আরসিসি. বিম-কলাম ছাড়াই ৩ কাঠা জমির উপর ১০ ইঞ্চি ইটের গাঁথুনিতে ছাদ দিয়ে একটি ১ তলা ভবন তৈরি করেন মনিরের বাবা গোলাম মোস্তফা। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে একইভাবে ২য় তলা এবং ২০০৭ সালে ৩য় তলা নির্মাণ করা হয়। ৩য় তলা নির্মাণের সময় ভবনটি পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে খানিকটা ডেবে (হেলে) যায়। তখন ঝুঁকির কথা ভেবে চারপাশে কিছু সাপোর্ট কলাম বসানো হলেও মূল কাঠামোগত দুর্বলতা কাটেনি।

 

প্রকৌশল বিজ্ঞানের ভাষায়, মূল কাঠামো বা ফাউন্ডেশনের সাথে সংযোগ না রেখে পরে বাইরে থেকে জোড়াতালি দিয়ে দেওয়া কলামকে “উৎকেন্দ্রিক” বা ত্রুটিপূর্ণ সাপোর্ট বলা হয়। এ বিষয়ে রাজউক তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান “ক্রেডো আর্কিটেক্টস” এবং গৃহায়ন ও গণপুর্ত মন্ত্রণালয়ের “হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট” এর সিনিয়র রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ার (স্ট্রাকচারাল ইঞ্জি:কন্সট্রাকশন) এর সাথে কথা বলে জানা যায় যে, “পুরাতন ও লোড বেয়ারিং ওয়াল স্ট্রাকচার বিশিষ্ট ৩ তলা ভবনের ওপরে ৪র্থ তলা নির্মাণ করা উচিত নয়।”

 

সূত্রে জানা যায়, এই ধরনের কাঠামো সাধারণত ১ থেকে ৩ তলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। দীর্ঘস্থায়ীভাবে লোড বেয়ারিং ওয়াল স্ট্রাকচার ভবনের সাধারণ নকশা বা ডিজাইন আয়ুষ্কাল সাধারণত ৫০ থেকে ৭৫ বছর ধরা হয়। অতিরিক্ত আর্দ্রতা, পানি জমা এবং ভূমিকম্পনজনিত আঘাত থেকে দূরে রাখতে না পারলে, সাধারণ আবাসিক ভবনের অর্থনৈতিক ও কার্যক্ষমতার মানদন্ড হিসেবে এ ধরনের সাধারণ কাঠামোর ডিজাইন লাইফ ৫০ বছর হয়ে থাকে বলেও মনে করেন কোনো কোনো পেশাদাররা। কারণ, এ ধরনের ভবনের সব ওজন সরাসরি দেয়ালের ওপর পড়ে। ৩ তলার ওপরে গেলেই নিচের দেয়াল অতিরিক্ত ওজনে ফেটে বা ধসে যেতে পারে। আর এই ভবনটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নির্মাণ (Costruction Joints) অর্থাৎ, ১৯৭৭, ২০০৪ এবং ২০০৭ সালের মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান রয়েছে। এত বছর পর পর জোড়াতালি দিয়ে ওপরের তলাগুলো করায় ওপরের তলার লোড বা ওজন নিচের তলার সাথে সঠিকভাবে স্থানান্তরিত হতে পারছে না বলেও মনে করেন অভিজ্ঞ মহল।

 

১৯৭৭ সালে নির্মাণ করা ১ম তলার বয়স এখন ৪৯ বছর। একটি সাধারণ লোড বেয়ারিং দেয়ালের কার্যক্ষমতার শেষ প্রান্তে চলে এসেছে এটি। ২য় ও ৩য় তলার বয়স যথাক্রমে ২২ ও ১৯ বছর। যদিও ওপরের তলাগুলোর বয়স কম, কিন্তু সেগুলো দাঁড়িয়ে আছে ৪৯ বছর বয়সী এবং দুর্বল একটি লোড বেয়ারিং ভিত্তির ওপর। তাই পুরো ভবনটির স্থায়িত্ব এখন আর বছরের হিসাবে নিরাপদ বলা যায় না।

 

বর্তমানে প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরনো এই দুর্বল ও একপাশে ডেবে যাওয়া ভবনের ৩য় তলার ওপর নতুন করে ৪র্থ তলা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয় কোনো ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং মূল্যায়ন, নকশা অনুমোদন বা রাজউকের অনুমতি ছাড়াই। যা যেকোনো সময় বড় ধরনের ভবন ধস ও প্রাণহানির মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে প্রতিয়মান হয়। এমতাবস্থায় ৪র্থ তলা নির্মাণে রাজউক অনুমোদনের কোনো কাগজপত্র দেখাতে না পারায় এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে মৌখিকভাবে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ অমান্য করায় ইতোমধ্যে ঐ বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে লিখিত নোটিশ জারি করা হয়েছে বলে রাজউকের জোন-৫ এ খোঁজ নিয়ে জানা যায়। রানা প্লাজা কিংবা পুরান ঢাকার নিমতলী ট্রাজেডির মতো বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটবার আগেই জনস্বার্থে রাজউকের এই পদক্ষেপে এলাকাবাসীর মাঝে স্বস্তির আমেজ লক্ষ্য করা গেছে।

 

অন্যদিকে ভিন্ন একটি সূত্রে জানা যায়, বাড়িওয়ালা মো. মনির স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এ কাজে রাজি হননি। বরং এলাকার এক দম্পতি- যারা মনিরের এই ৩ তলা ভবনেই ৫ টি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত তাদের “মহিলা হেস্টেল” ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন- তারাই এবার ব্যবসার পরিধি বাড়াতে এবং লাভের অংক কষে মনিরকে বুঝিয়ে তার এই পুরোনো ভবনে ৪র্থ তলা নির্মাণের মতো এক ভয়ঙ্কর কাজের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিয়েছিলেন। তারাই মূল চক্রান্তকারী হিসেবে মনিরকে এ কাজে রাজি করিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আরও জানা যায় যে, শুধু মনিরের বাড়িতেই নয়, বটতলা আবাসিক এলাকার বেশ কিছু বাড়িতে রয়েছে এই দম্পতির অবৈধ ও বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত “মায়ের আদর ছাত্রী নিবাস” নামক মহিলা হোস্টেল ব্যবসা। এ বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেখতে চোখ রাখুন জাতীয় সাপ্তাহিক “বার্তা বিচিত্রা” পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায়।