প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সময়: ০৫:২০ পিএম
জ্বালানি সংকট কাটাতে সংসদে সরকারের পরিকল্পনা জানালেন প্রধানমন্ত্রী
দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট কাটিয়ে দেশকে জ্বালানিতে স্বনির্ভর ও টেকসই ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে সরকার বহুমাত্রিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের মৌখিক প্রশ্নের জবাবে তিনি সরকারের এসব পরিকল্পনার কথা জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে সক্ষমতা অনুযায়ী কাজে লাগানো হয়নি। দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট কাটাতে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন গ্যাসের অনুসন্ধান, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের জ্বালানি ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) নতুন গ্যাস যুক্ত হয়েছে।
বর্তমানে আরও সাতটি কূপের খননকাজ চলছে। এসব কূপের কাজ শেষ হলে গ্রিডে অতিরিক্ত ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে। অবশিষ্ট কূপগুলো পর্যায়ক্রমে খননের জন্যও নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
নতুন গ্যাসের অনুসন্ধান জোরদারে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার বড় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করতে দুটি আধুনিক রিগ কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অফশোর ও অনশোর মডেল পিএসসির (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) আওতায় ব্যাপক অনুসন্ধান চলছে। পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর আন্তর্জাতিক বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদনের প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
এদিকে সামুদ্রিক এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এ টার্মিনাল থেকে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ সম্ভব হতে পারে। এতে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বাড়বে।
জরুরি ভিত্তিতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল কিংবা পায়রা ও মোংলা বন্দর এলাকায় আরও এক থেকে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিশেষ উদ্যোগ
সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ২০২৬ সালের ৮ জুনের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারিসহ প্রয়োজনীয় উপাদানের ওপর কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর ও অতিরিক্ত অগ্রিম আয়করসহ বিভিন্ন শুল্কে সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া হয়েছে।
রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপনকারীদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাসাবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনকারীদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ১৫ পয়সা দরে কিনবে বলে জানান তিনি।
সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে। অন্যান্য সরকারি দপ্তরেও তা বাস্তবায়নে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি বায়ু বিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত পরিকল্পনাও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
সরকারের এসব উদ্যোগের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।