প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সময়: ০৩:৫৬ পিএম
রাষ্ট্র সংস্কার ও জননিরাপত্তা: ছয় মাসের পথচলা
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
ভঙ্গুর রাষ্ট্রকাঠামো, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ এবং পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আস্থার সংকটের মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্র সংস্কার ও জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার। মব সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, উগ্রবাদ, মাদক এবং সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে গত ছয় মাসে দেশব্যাপী ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
সরকার ও পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, অপরাধী গ্রেফতার, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, দ্রুত তদন্ত এবং প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে অপরাধের বিভিন্ন সূচক কমার দাবি করা হলেও মব সহিংসতা, নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা, গুজব এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা এখনো প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
হত্যাসহ প্রধান অপরাধে নিম্নমুখী প্রবণতা
পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশনস শাখার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে প্রধান কয়েকটি অপরাধের সংখ্যা কমেছে।
২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে দেশে ২ হাজার ৬০৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হলেও ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৫০টিতে। অর্থাৎ হত্যাকাণ্ড কমেছে ৩৫৭টি।
নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার ক্ষেত্রেও নিম্নমুখী প্রবণতার কথা জানিয়েছে পুলিশ। গত বছরের প্রথম আট মাসে ১১ হাজার ২৬৯টি মামলার বিপরীতে চলতি বছরের একই সময়ে ৯ হাজার ৮৪টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কমেছে ২ হাজার ১৮৫টি মামলা।
ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলাও ৪ হাজার ৬৬৬টি থেকে কমে ৪ হাজার ২৬৪টিতে দাঁড়িয়েছে বলে পুলিশি পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।
মব সহিংসতার ঘটনা গত বছরের ৮৯টি থেকে কমে ৫৬টিতে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে রেকর্ড হওয়া ঘটনার সংখ্যা ৯৯৯ থেকে কমে ১৬৩টিতে নেমেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজারের বেশি গ্রেফতার
অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে গত কয়েক মাসে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান চালিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সরকারের সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে মোট ৫৩ হাজার ৫১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে ৮১০টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১০ হাজার ৩৮০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছেন ১ হাজার ১৮৮ জন।
মাদকবিরোধী অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ১ কোটি ৩৪ লাখের বেশি ইয়াবা, ৭৫ দশমিক ৬ কেজি হেরোইন এবং ৩৮ দশমিক ৭ টন গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক।
ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৭ হাজার ৬৬৮ জনকে গ্রেফতারের পাশাপাশি ৫০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল, ৩১ দশমিক ৭ কেজি বিস্ফোরক এবং বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় আলোচিত সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ‘পিচ্চি রাজা’কে গত ২০ মে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়।
জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের প্রায় ৪ হাজার সদস্যের অংশগ্রহণে যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় অভিযানের মাধ্যমে সরকারের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক অভিযানও অব্যাহত রয়েছে। গত ৭ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ১ হাজার ৯৫৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যসূত্র জানিয়েছে। গ্রেফতারদের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ৭৩ জন সদস্য রয়েছেন।
দ্রুত তদন্তে আলোচিত কয়েকটি মামলা
শিশু হত্যা ও ধর্ষণের কয়েকটি আলোচিত মামলায় দ্রুত তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতিকে সাম্প্রতিক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পল্লবীর সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় ঘটনার ছয় দিনের মধ্যে তদন্ত ও ডিএনএ প্রতিবেদন সম্পন্ন করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। মামলায় ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় আদালত রায় ঘোষণা করেন।
চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছর বয়সী শিশু ফারিয়াকে ধর্ষণের ঘটনায়ও দ্রুত তদন্ত শেষে ১৩ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আদালত আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ে নতুন উদ্যোগ
আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড শনাক্তে পুলিশ সদর দপ্তরের এলআইসি শাখা প্রযুক্তিগত পর্যবেক্ষণ করছে।
সরকারপ্রধান, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় বিষয় নিয়ে ছড়ানো ২ হাজার ৫৪৪টি বিভ্রান্তিকর লিংক শনাক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সহযোগিতায় ৯৯১টি লিংক অপসারণ করা হয়েছে।
অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেফতারের তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনী নিরাপত্তায় বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ উপনির্বাচনে প্রথমবার সব কেন্দ্রে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশে এআইভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা ও আধুনিক সিসিটিভি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ব্যবহারও বাড়ানো হচ্ছে।
নিয়োগে স্বচ্ছতার উদ্যোগ
পুলিশ বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও মেধাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে ২ হাজার ৬৬৫ জন কনস্টেবল নিয়োগ দিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করা হয়েছে। পাশাপাশি ২ হাজার ক্যাডেট এএসআই নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিন ধাপে ৩৯ জন পুলিশ সদস্যকে আর্থিক পুরস্কার ও সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
কমেছে অপরাধ, তবে কাটেনি চ্যালেঞ্জ
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে এখনো বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ৩৬টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৩০ জনের প্রাণহানি হয়েছে। একই সময়ে পুলিশের ওপর ১০৬টি হামলায় একজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ২৩০ জন আহত হয়েছেন।
১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি সংগঠনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ২৬৩টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ৫৯টি মামলায় ২৫২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী, গাজীপুর ও পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে বরিশালের আগৈলঝাড়ায় এক আসামির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে থানায় হামলার ঘটনায় ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ঝিনাইদহ, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ, পুলিশের ওপর হামলা এবং অর্থনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার ঘটনাও ঘটেছে।
এখন বড় পরীক্ষা জনআস্থা পুনরুদ্ধার
ছয় মাসের পরিসংখ্যানে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ অভিযান, অস্ত্র-মাদক উদ্ধার এবং প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের কিছু দৃশ্যমান অগ্রগতির দাবি করছে সরকার। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু গ্রেফতার ও বিশেষ অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়।
পুলিশের পেশাদারিত্ব, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কার্যক্রম, জবাবদিহি, মানসম্মত তদন্ত এবং নাগরিকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা না গেলে জনআস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
অপরাধের হার কমার সরকারি দাবি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চ্যালেঞ্জ—এই দুই বাস্তবতার মধ্যেই এখন এগোচ্ছে দেশের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার পুনর্গঠন। বিশেষ অভিযান ও কঠোরতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কতটা টেকসই করা যায়, সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
রাষ্ট্র সংস্কারের এই পর্যায়ে সরকারের সাফল্যের সবচেয়ে বড় মানদণ্ড হবে শুধু কতজন অপরাধী গ্রেফতার হলো বা কতটি অস্ত্র উদ্ধার হলো তা নয়; বরং সাধারণ নাগরিক কতটা নিরাপদ বোধ করছেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কতটা আস্থা ফিরে আসছে—সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এই ছয় মাসের উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য।