প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সময়: ০৮:৪১ পিএম
নাগরিকসেবায় ১৫ বছর: মানুষের প্রয়োজনে ছুটে চলা কুলিয়ারচরের অভিলাষ চন্দ্র ভৌমিক
মোঃ মাইন উদ্দিন :
সাফল্যের সংজ্ঞা সবার কাছে এক নয়। কারও কাছে সাফল্য মানে বড় পদ, কারও কাছে অর্থ-সম্পদ, আবার কারও কাছে মানুষের ভালোবাসা এবং আস্থা অর্জন করা সব থেকে বড় প্রাপ্তি। অভিলাষ চন্দ্র ভৌমিকের জীবনের গল্পটিও যেন সেই ভিন্নতর সাফল্যেরই গল্প।
পড়াশোনা শেষ করে সরকারি-বেসরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। সেই সিদ্ধান্তই গত ১৫ বছরে তাঁকে কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের মানুষের কাছে একজন পরিচিত নাগরিকসেবা প্রদানকারী ও সামাজিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের নাপিতেরচর গ্রামে জন্ম অভিলাষ চন্দ্র ভৌমিকের। পিতা স্বর্গীয় ক্ষিতীশ চন্দ্র ভৌমিক, মাতা আরতী রানী ভৌমিক। তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষা নাপিতেরচর গ্রামে গ্রামীণ পরিবেশে। নিজের এলাকার মানুষের জীবনযাপন, প্রয়োজন ও নানা সমস্যাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। হয়তো সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে নিজের এলাকার মানুষের জন্য কাজ করার আগ্রহকে আরও দৃঢ় করেছিল।
তিনি শিক্ষাজীবনেও ছিলেন মনোযোগী। ১৯৮৫ সালে ৩নং নাপিতেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। এরপর ফরিদপুর ইউনিয়ন আব্দুল হামিদ ভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৯১ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন ভৈরব হাজী আসমত কলেজে। সেখান থেকে ১৯৯৩ সালে এইচএসসি এবং ১৯৯৫ সালে বিএ পাস করেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করার পর তাঁর সামনে ছিল প্রচলিত কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ। কিন্তু সরকারি বা বেসরকারি চাকরির প্রতি তেমন আগ্রহী ছিলেন না তিনি। নিজের এলাকায় থেকে মানুষের সেবা করার ইচ্ছাই ছিল বেশি। মানুষের প্রয়োজনের সময়ে কাজে আসা, বিভিন্ন নাগরিক সেবা পেতে তাঁদের সহযোগিতা করা- এই চিন্তা থেকেই কর্মজীবনের একটি ভিন্ন পথ বেছে নেন অভিলাষ।
তাঁর সাথে আড্ডায় বসে আলাপচারিতায় উঠে আসে- ২০১১ সালে সেই সুযোগ সামনে আসার গল্প। তৎকালীন ফরিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ জিল্লুর রহমান জিলন তাঁকে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে নিয়োগ দেন। তখন থেকেই ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠে। গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সেবা তখনও অনেকটা নতুন। কিন্তু অভিলাষ চন্দ্র ভৌমিক সেই থেকেই মানুষের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা দেওয়ার কাজে যুক্ত হন।
এরপর পেরিয়ে গেছে ১৫ বছর। ২০১১ থেকে ২০২৬- দীর্ঘ এই সময়ে তাঁর কাজের পরিধিও বেড়েছে। জন্মনিবন্ধন থেকে মৃত্যু নিবন্ধন, উত্তরাধিকার সনদ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রত্যয়নপত্র, নতুন ভোটার হওয়ার আবেদন থেকে ভোটার তথ্য সংশোধন ও স্থানান্তর- নানা নাগরিকসেবা নিতে মানুষ তাঁর কাছে এসেছেন। পাসপোর্টের আবেদন ও প্রসেসিংসহ বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক সেবার ক্ষেত্রেও তিনি সহযোগিতা করে আসছেন।
গ্রামের একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে এসব সেবা অনেক সময় শুধু একটি আবেদন বা কাগজপত্রের বিষয় নয়। একটি জন্মনিবন্ধন সন্তানের ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত, একটি ভোটার সংশোধন নাগরিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত, আবার একটি উত্তরাধিকার সনদ পরিবার ও সম্পত্তির নানা প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ। এসব কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রয়োজনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত হয়েছেন অভিলাষ।
তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো- দল-মত নির্বিশেষে মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের সেবাগ্রহীতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ, পেশা ও সামাজিক অবস্থান থেকে আসেন। দীর্ঘদিন একই জায়গায় কাজ করতে গিয়ে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। এভাবেই নাগরিকসেবা প্রদানের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক।
তবে অভিলাষ চন্দ্র ভৌমিকের পরিচয় শুধু ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের সেবাদাতা হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও রয়েছে তাঁর সম্পৃক্ততা। ফরিদপুর ইউনিয়ন আব্দুল হামিদ ভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদে পরপর দুইবার অভিভাবক সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই সম্পৃক্ততা তাঁকে স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত রেখেছে।
বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, ফরিদপুর ইউনিয়ন শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ধর্মীয় উৎসব আয়োজন ও সামাজিক সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। নাপিতেরচর শ্রী শ্রী জয়কালী মন্দিরের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবেও দুইবার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
তাঁর এগিয়ে চলা এখানেই শেষ নয়। নাপিতেরচর শ্রী শ্রী জয়কালী মন্দিরের কীর্তন পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। অর্থাৎ নাগরিকসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নিজ এলাকার ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।
ব্যক্তিজীবনেও রয়েছে তাঁর সন্তানের শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন নিয়ে স্বপ্নপূরণের গল্প। তিনি এক ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। ছেলে বর্তমানে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত এবং পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত। বড় মেয়ে সিলেট নার্সিং কলেজে বিএসসি নার্সিং দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। ছোট মেয়ে ২০২৬ সালে ফরিদপুর ইউনিয়ন আব্দুল হামিদ ভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এ+ নিয়ে এসএসসি পাস করেছেন।
সত্যিই- একজন বাবার কাছে সন্তানের অর্জন যেমন আনন্দের, তেমনি দীর্ঘ কর্মজীবনে মানুষের আস্থা অর্জনও হতে পারে এক ধরনের পারিবারিক গর্ব। অভিলাষ চন্দ্র ভৌমিকের ক্ষেত্রেও দুটি বিষয় যেন পাশাপাশি চলে এসেছে- একদিকে নিজের কর্ম ও সামাজিক সম্পৃক্ততা, অন্যদিকে সন্তানদের শিক্ষা ও কর্মজীবনের এগিয়ে চলা।
জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি হয়তো বড় কোনো পদ-পদবি বা চাকরির পরিচয়কে সামনে রাখেননি। বরং নিজের জন্মভূমিতে থেকেই মানুষের প্রয়োজনের সময়ে কাজে লাগার চেষ্টা করেছেন। ইউনিয়ন পর্যায়ের নাগরিকসেবা থেকে সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ড- বিভিন্ন পরিসরে তাঁর এই সম্পৃক্ততা তৈরি করেছে আলাদা একটি পরিচয়।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৯৫ সালে বিএ পাস করার পর যে মানুষটি প্রচলিত চাকরির পথে না গিয়ে নিজের এলাকায় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ২০১১ সালে সেই সিদ্ধান্ত তাঁকে নিয়ে যায় ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের নাগরিকসেবার জগতে। এরপর কেটে গেছে দেড় দশক। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, নাগরিকসেবার ধরন বদলেছে, কিন্তু মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা থেকেই গেছে।
তাই সফলতার গল্প সবসময় আলোঝলমলে অফিস, বড় পদ কিংবা বিপুল সম্পদের গল্প নয়। কখনো কখনো নিজের মাটিতে থেকে, নিজের মানুষগুলোর প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়িয়ে, বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করাও হয়ে ওঠে সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অভিলাষ চন্দ্র ভৌমিকের জীবনযাত্রা আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়- মানুষের সেবায় দীর্ঘদিন নিজেকে নিয়োজিত রাখাও একজন মানুষের বড় অর্জন হতে পারে।