প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সময়: ০৭:০৮ পিএম
রাজনীতির মঞ্চ কি অশোভন আচরণের প্রদর্শনী হয়ে উঠবে?
মোঃ মাইন উদ্দিন :
রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য। রাষ্ট্র পরিচালনা, জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আইনের শাসন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা- এসবই রাজনীতির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে জড়িত। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে একজন ব্যক্তির কিছু কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে গঠনমূলক রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বিতর্ক, উত্তেজনা ও হাস্যরসই যেন বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো-রাজনীতিকে কি আমরা এমন এক জায়গায় নিয়ে যেতে চাই, যেখানে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে অস্বাভাবিক আচরণই মানুষের বেশি মনোযোগ কেড়ে নেবে? আনাম আয়াস নামের এক ব্যক্তিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিও ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এসব ভিডিওর সত্যতা, প্রেক্ষাপট ও আইনগত দায় নির্ধারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়। তবে কোনো ব্যক্তির আচরণ যদি জনমনে উত্তেজনা সৃষ্টি করে, অন্যের মর্যাদা বা ব্যক্তিগত পরিসর নিয়ে প্রশ্ন তোলে কিংবা সামাজিক বিরোধ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করে, তাহলে এটি ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না- সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মাগুরায় সাবেক এমপি ও বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের বাড়ির গেটের সামনে ওই ব্যক্তির অশোভন আচরণের দৃশ্য দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ভিডিওতে সাকিব আল হাসানকে উদ্দেশ করে বক্তব্য দেওয়ার দৃশ্যও রয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। বিষয়টি সত্যিই ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সাকিব আল হাসানকে নিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত সমালোচনা থাকতেই পারে। কিন্তু সমালোচনারও একটি সভ্য ও আইনসম্মত পথ রয়েছে। মতের বিরোধ হলে বক্তব্য, যুক্তি, লিখিত প্রতিবাদ কিংবা আইনগত প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেওয়া যায়। কাউকে হেয় করা, তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরে গিয়ে অশোভন আচরণ করা কিংবা এমন কর্মকাণ্ডের ভিডিও ছড়িয়ে সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করা কোনো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচায়ক হতে পারে না।
এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটি সামনে আসে। রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব নাগরিকের আইনগত অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কেউ জনপ্রিয় হোন বা অজনপ্রিয়, ক্ষমতাসীন হোন বা বিরোধী- আইনের দৃষ্টিতে সবার জন্য একই মানদণ্ড থাকা জরুরি। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছেন কি না, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না- তদন্ত, প্রমাণ ও যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তা নির্ধারিত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ভিডিও মুহূর্তেই হাজারো মানুষের আবেগকে উত্তেজিত করতে পারে। একটি উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা হুমকি, গালাগালি, হামলা বা সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সতর্ক থাকা।
রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির প্রয়োজন বা কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয় না, রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সংবিধান, আইন, প্রতিষ্ঠান ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে। আনাম আয়াস রাষ্ট্রের জন্য কতটা উপকারী বা ক্ষতিকর- এই হিসাবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর কর্মকাণ্ড আইনসম্মত কি-না এবং তা জননিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর কি ধরনের প্রভাব ফেলছে। আমরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাই, যেখানে বক্তব্যের জবাব বক্তব্য দিয়ে, সমালোচনার জবাব যুক্তি দিয়ে এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি আইনের মাধ্যমে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা জনপ্রিয়তা কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলতে পারে না, আবার কারও বিরুদ্ধে জনরোষও কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার দেয় না।
সুতরাং আনাম আয়াসকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা না বাড়িয়ে সংশ্লিষ্ট ভিডিও এবং অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, আর অভিযোগ অসত্য বা বিভ্রান্তিকর হলে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধেও প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকা দরকার। রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্নটি তাই সরল- রাষ্ট্র কি একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আবেগ ও উত্তেজনার রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেবে, নাকি আইনের শাসন, নাগরিকের মর্যাদা ও জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেবে?
রাজনীতি মানুষের জন্য। রাজনীতির মঞ্চকে অশোভন আচরণের প্রদর্শনীতে পরিণত করা যেমন কাম্য নয়, তেমনি কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে জনমনে অযথা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়াও রাষ্ট্র এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর নয়। একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রে ব্যক্তির কর্মকাণ্ড নয়, আইনই হবে শেষ কথা- এই বিশ্বাসই প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।