প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সময়: ০৮:৪৬ পিএম
রাষ্ট্রের কাছে শিশুর জীবন কতটা নিরাপদ?
মোঃ মাইন উদ্দিন :
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে সাত বছরের শিশু মীমের করুণ মৃত্যু আবারও আমাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে- এই রাষ্ট্রে একটি শিশুর জীবন কতটা নিরাপদ?
গণমাধ্যমে এসেছে, নানাবাড়ি যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল মীম। এরপর আর বাড়ি ফিরে আসেনি। পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি করেছেন, স্বজনরা ছুটেছেন বিভিন্ন জায়গায়। শেষ পর্যন্ত নিখোঁজের দুই দিন পর একটি পুকুরপাড়ের ঝোপ থেকে উদ্ধার হলো তার মরদেহ। পুলিশ মরদেহের ময়নাতদন্তে পাঠিয়েছিলো, ঘটনার তদন্তও চলছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার পেছনে কি রয়েছে, তা নিশ্চয় তদন্তে স্পষ্ট হবে।
কিন্তু তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রের কাছে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে দ্রুত খুঁজে বের করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? পরিবারের অভিযোগ পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কতটা দ্রুত হয়? একটি শিশুকে নিরাপদে ঘরে ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রের বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো কতটা প্রস্তুত?
শিশু নিখোঁজ হওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। প্রতিটি মিনিট তখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে সময় যত গড়ায়, ঝুঁকিও তত বাড়ে। তাই এমন পরিস্থিতিতে শুধু পরিবারের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে আসতে হয়।
মীমের মৃত্যু আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে- শিশুদের নিরাপত্তা কি কেবল পরিবারের দায়িত্ব, নাকি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধী খুঁজে বের করা নয়, অপরাধ প্রতিরোধ, ঝুঁকি শনাক্ত করা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ।
সাত বছরের একটি শিশুর মরদেহ যখন নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর উদ্ধার হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মনেও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। কোথায় ছিল শিশুটি? কিভাবে সে নিখোঁজ হলো? কেউ তাকে দেখেছিল কি না? অনুসন্ধান কতটা বিস্তৃত ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
তবে কোনো ঘটনা নিয়ে আবেগের বশে আগেই কাউকে অপরাধী বানিয়ে ফেলা, কিংবা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযোগ করাও সমীচীন নয়। আইনের শাসনের স্বার্থেই সত্য উদঘাটনের পথটি হতে হবে নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর।
কিন্তু রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একটি শিশুর জীবন কোনো পরিসংখ্যান নয়। একটি শিশু মানে একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎ। একটি শিশুর মৃত্যু মানে শুধু একজন মানুষের জীবন থেমে যাওয়া নয়, একটি পরিবারের পৃথিবী বদলে যাওয়া।
মীম আর কোনোদিন তার নানাবাড়ি যাবে না। তার পরিবার আর তাকে ফিরে পাবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যেন কেবল আরেকটি সংবাদ হয়ে কয়েক দিন পর মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে না যায়। এই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হোক। যদি অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, অপরাধী যে-ই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হোক। তদন্তে যদি কারও দায়িত্বে গাফিলতি বা ব্যর্থতার প্রমাণ পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রেও যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক।
রাষ্ট্রের কাছে মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়- নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার। কারণ
যে দেশে একজন বাবা-মা সন্তানকে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন না, যে দেশে একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারকে উৎকণ্ঠায় দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়, সেই বাস্তবতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে- আমরা কি সত্যিই শিশুদের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পেরেছি?
মীমের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়, এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর শুধু কথায় নয়, কার্যকর পদক্ষেপে দিতে হবে।