চুরির অপবাদে খুঁটিতে বাঁধা বাবা: তখন অসহায় তুবা এবং আমাদের সমাজ

মোঃ মাইন উদ্দিন :

চুরির অভিযোগে একজন মানুষকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। তখন তার ছোট্ট মেয়ে পাশে গিয়ে বাবার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। ভিডিওটি দেখলে সচেতন যে কারোর মনে প্রথম যে প্রশ্নটি সামনে আসবে, তা হলো- অভিযোগ থাকলেই কি একজন মানুষকে এভাবে অপমান ও আটকে রাখার অধিকার কারও আছে?

ঘটনাটি বরিশালের উজিরপুর এলাকার বলে জেনেছি। ভিডিওটি দেখার পর বিষয়টি যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয় "ওয়াব ফাউন্ডেশন" নামের একটি স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন। ওয়াবের স্বেচ্ছাসেবক টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে- "এস.এম আকবর" নামের ফেসবুক পেইজ থেকে বিস্তারিত তুলে ধরে একটি স্ট্যাটাস দেয়। স্ট্যাটাস থেকে জানা যায়, ছোট্ট মেয়েটির নাম তুবা। ওয়াব টিমের কাছে বাবার মুখে খাবার তুলে দেওয়া সেই শিশু তুবার সবচেয়ে বড় চাওয়া- তার বাবা যেন একটি কাজ পান এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন।

তবে শুরুতেই একটি বিষয় এখানে পরিষ্কার করা জরুরি। অনিক শিকদারের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ থাকলেও অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে-এমন কোনো তথ্য এ ঘটনায় ধরে নেওয়া যায় না। কেননা, কাউকে চোর বলে সামাজিকভাবে চিহ্নিত করে দেওয়া আর আদালত বা আইনগত প্রক্রিয়ায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। অভিযোগের তদন্ত হবে, প্রমাণ যাচাই হবে এবং প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা, অপমান করা বা জনসমক্ষে শাস্তি দেওয়া কোনোভাবেই আইনসম্মত বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।

ওয়াব টিম এই ঘটনার আরও কিছু তথ্য সামনে এনেছে, যা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করে। অনিক শিকদারের বাবা একসময় একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ ছিলেন। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁর চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারটি আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। পরে অনিক নেশায় জড়িয়ে পড়েছিলেন বলেও স্থানীয়ভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। আর তাঁর এ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় মাদকসংশ্লিষ্ট একটি চক্র তাঁকে ব্যবহার করেছে- এমন অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা ঠিক হবে না।

তবে একটি প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই- একজন মানুষ নেশায় জড়িয়ে পড়লে তাকে আমরা কি করি? তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করি, অপমান করি, খারাপ মানুষ বলে চিহ্নিত করি, নাকি চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি করি?

মাদকাসক্তি কোনো ব্যক্তির জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি তার পরিবারের জন্যও ভয়াবহ বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে দরিদ্র বা নিম্ন আয়ের পরিবারে একজন উপার্জনক্ষম সদস্য নেশায় জড়িয়ে পড়লে পুরো পরিবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পড়ে। তখন শুধু ব্যক্তিকে দোষারোপ করে সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজন হয় পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ।

অনিক শিকদারের ক্ষেত্রে সেই উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ওয়াব ফাউন্ডেশন। তিনি নিজের ভুল-ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান- এমন তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রামীণ এলাকায় জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি একটি অটোভ্যান চেয়েছেন। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে তাঁকে একটি অটোভ্যান দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর মেয়ে তুবার লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ারও আগ্রহ প্রকাশ করেছে ওয়াব টিম।

এই উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই স্পষ্ট, এটি শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, একজন মানুষকে আয় করার সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা। কাউকে একবার কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করা যায়, কিন্তু একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা তাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়। অনিক যদি সত্যিই নতুনভাবে জীবন শুরু করতে চান, তাহলে কর্মসংস্থান সেই পরিবর্তনের একটি বাস্তব ভিত্তি হতে পারে।

তবে পুনর্বাসনের সঙ্গে জবাবদিহিও থাকতে হবে। তাঁর বিরুদ্ধে যদি কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ থাকে, সেটির আইনগত তদন্ত হতে হবে। একইভাবে তাঁকে বেআইনিভাবে আটকে রাখা বা নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এক পক্ষের অভিযোগ শুনে অন্য পক্ষকে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগের আড়ালে কোনো বেআইনি আচরণকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়।

বিষয়টি নিয়ে উজিরপুর থানা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করাছে ওয়াব টিম। থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) ফারুক বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি সার্বিকভাবে দেখাশোনার কথাও জানিয়েছেন। এখন প্রয়োজন বিষয়টির যথাযথ অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য জানা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি অবশ্য এই ঘটনায় অনিক নন, তাঁর ছোট্ট মেয়ে তুবা। সে কোনো আইন বোঝে না, তদন্ত বোঝে না, অভিযোগের ভাষাও বোঝে না। সে শুধু বোঝে এ মানুষটি তার বাবা, তিনি যেন ভালো থাকেন। বাবার মুখে খাবার তুলে দেওয়ার দৃশ্যটি তাই শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি আমাদের সামাজিক আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

আমরা প্রায়ই অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতার কথা বলি। সেটি প্রয়োজনও। কিন্তু কঠোরতা কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অনুমতি হতে পারে না। অপরাধ দমনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর একজন মানুষ যদি ভুল পথে গিয়ে থাকে, তাকে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করাও সমাজের দায়িত্ব।

অনিক শিকদার অপরাধী কি না, সেটি নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া। কিন্তু তিনি যদি নেশা থেকে বেরিয়ে কাজ করতে চান, তাহলে তাঁকে সেই সুযোগ দেওয়া উচিত। কারণ একজন মানুষকে সারাজীবন তার অতীতের ভুলের সঙ্গে বেঁধে রাখা কোনো সমাধান নয়।

আর তুবার মতো একটি শিশুর ভবিষ্যৎ যেন তার বাবার ভুল, পরিবারের দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক অপমানের সঙ্গে আটকে না যায়- সেটিও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। চুরির অভিযোগের সত্যতা অবশ্য তদন্তে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু একটি শিশুর বাবাকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখার দৃশ্য আমাদের যে প্রশ্নটি করে গেছে, তার উত্তর আমাদেরই দিতে হবে- আমরা কি শুধু শাস্তি দিতে জানি, নাকি একজন মানুষকে ভুল থেকে ফিরে এসে সৎভাবে বাঁচার সুযোগও তৈরি করে দিতে পারি?