পঞ্চগড়ে সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোটি টাকার সম্পদ ও জমি দখলের অভিযোগ

মোঃ মাহমুদুল হাসান বাবু পঞ্চগড় প্রতিনিধি

অন্যের জমিতে চাষাবাদ করে সংসার চলত পরিবারের। ২০১১ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর বদলাতে থাকে আর্থিক অবস্থা। দেড় দশকের ব্যবধানে নিজের, মা, ভাই ও বোনের নামে একের পর এক জমি কেনা, কয়েক একর জমি বন্ধক নেওয়া এবং রংপুর শহরে জায়গা থাকার অভিযোগ উঠেছে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জের বাসিন্দা ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমান বাজারমূল্যে এসব সম্পদের পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা। পাশাপাশি অন্যের জমি দখলেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ওমর ফারুক রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত। বর্তমানে তিনি নীলফামারীর ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে সংযুক্তিতে রয়েছেন। তার বাড়ি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার চিলাহাটি ইউনিয়নের চরতিস্তাপাড়া গ্রামে। তিনি মৃত আছর আলীর ছেলে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি চাকরির আগে ওমর ফারুকের পরিবারের তেমন সম্পদ ছিল না। চাকরিতে যোগদানের পর গত প্রায় ১৫ বছরে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এ বিষয়ে বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

দলিলেই মিলছে একের পর এক জমি কেনার তথ্য
এ প্রতিবেদকের হাতে থাকা কয়েকটি জমির দলিল ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৮ সালে নিজের নামে ৬৬ শতক, ২০২২ সালের ১৬ মে ৩৩ শতক, ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট ২০ শতক, একই বছরের ১৭ নভেম্বর ২৮ দশমিক ২৩ শতক এবং ৪ ডিসেম্বর ১২ শতক জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।

এ ছাড়া পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যৌথভাবেও জমি কেনার তথ্য রয়েছে। ২০২৩ সালের ১২ মার্চ ভাই ফজলুল রহমানের সঙ্গে ২০ শতক, ২০২২ সালের ১৬ মে বোন গোলাপির সঙ্গে ১৯ শতক এবং ২০১৬ সালের ২৩ মার্চ মা ফাতেমা বেগমের সঙ্গে ৫০ শতক জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এসবের বাইরে কয়েক একর জমি বন্ধক নেওয়া এবং রংপুর শহরে দুটি জায়গা থাকার তথ্যও রয়েছে।
চরতিস্তাপাড়ায় ওমর ফারুকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একটি পাকা বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। বাড়িটিতে স্ত্রী, দুই সন্তান, মা ও ছোট ভাই থাকেন। স্থানীয়দের দাবি, বাড়িটি নির্মাণে প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি চাকরির ছোট একটি পদে থেকে পরিবার চালানোর পাশাপাশি ছোট ভাইয়ের রংপুরে পড়াশোনার খরচ বহন করে এত জমিজমা ও সম্পদ কীভাবে করা সম্ভব হয়েছে। তাদের দাবি, ওমর ফারুকের বাবা ও চাচাদের তেমন সম্পদ ছিল না। এখনো তার কয়েকজন চাচাতো ভাই অটোভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।

ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে অন্যের জমি দখলেরও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় তিন ব্যক্তি। দেবীগঞ্জের চিলাহাটি ইউনিয়নের শেখবাধা গ্রামের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান সরকার দাবি করেন, তার ৩২ শতক পৈতৃক জমি দখল করেছেন ওমর ফারুক।
আসাদুজ্জামান বলেন, গত ১ জুলাই দিবাগত রাত থেকে ২ জুলাই ভোরের মধ্যে কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে তার জমিতে ইট, বালু, সিমেন্ট ও কংক্রিটের পিলার ব্যবহার করে গরুর সেড নির্মাণ করা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনাস্থলে গেলে তাকে গালিগালাজ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মারমুখী আচরণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জয়পুরহাটের বাসিন্দা রেহেনা বেগমের অভিযোগ, তার ২০ শতক জমি প্রায় দেড় বছর আগে দখল করে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে ইউনিয়ন পরিষদে অভিযোগ করেছিলেন। তবে সেখানে ওমর ফারুক উপস্থিত হননি।
রেহেনা বেগম বলেন, আমার বাড়ি জয়পুরহাটে। স্বামী অসুস্থ থাকায় এত দূরে বারবার যাওয়া সম্ভব হয় না। এই সুযোগে আমার জমিটি দখল করে নেওয়া হয়েছে।
চরতিস্তাপাড়ার বাসিন্দা নওশেদের অভিযোগ, রাতের বেলা তার পাঁচ শতক জমি দখল করে বেড়া দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ওরা সরকারি চাকরি করে, তাদের শক্তি বেশি। আমি ওর বিরুদ্ধে কথা বললেই হুমকি দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ওমর ফারুকের চাচাতো ভাইয়েরা এখনো অটোভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। অথচ চাকরি হওয়ার পর তিনি কীভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন, সেটি তদন্ত হওয়া দরকার। প্রতি বছরই নতুন নতুন দামি মোটরসাইকেল পরিবর্তন করেন বলেও এলাকায় আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি কর্মচারী হিসেবে ওমর ফারুকের আয় ও সম্পদের হিসাব খতিয়ে দেখা হলে তার সম্পদ অর্জনের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওমর ফারুক বলেন, চাকরির পর আমি কিছু জমি কিনেছি। তবে যতগুলো বলেছেন, এতটা না। মানুষ বললে করার কিছু নেই। এরপর তিনি এ বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে রাজি হননি।