সোনারগাঁয়ের মাটিতে ছয় শতকের ইতিহাস, নীরব সাক্ষী গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি

এস এম মিঠু, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি:

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ—বাংলার প্রাচীন রাজধানীর স্মৃতিবিজড়িত এক ঐতিহাসিক জনপদ। এখানকার মাটির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস। সেই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি।

সোনারগাঁ উপজেলার শাহচিলাপুর এলাকায়, পাঁচপীর দরগাহের প্রায় ১০০ ফুট পূর্বে পুরোনো মাঘদীঘির এক প্রান্তে অবস্থিত এই সমাধি। সুলতানি আমলের স্মৃতি বহনকারী স্থাপনাটি আজও অতীতের গৌরবের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ছিলেন প্রথম ইলিয়াস শাহী বংশের তৃতীয় সুলতান। তিনি ১৩৮৯ থেকে ১৪১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার শাসক ছিলেন। সুশাসন, জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যপৃষ্ঠপোষকতার জন্য তাঁর নাম ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

পাথরের বুকে অপূর্ব কারুকাজ

সমাধিটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর পাথরের কারুকাজ। সরকারি সোনারগাঁ উপজেলা তথ্য অনুযায়ী, সমাধিতে মনোরম কষ্টিপাথরের অলংকরণ ও শিলালিপিযুক্ত পাথরের কাঠামো রয়েছে। স্থাপনাটির কারুকাজে সুলতানি আমলের শিল্পরুচির ছাপ স্পষ্ট।

বাংলাপিডিয়ার তথ্যেও গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধিকে বাংলার সুলতানি আমলের উল্লেখযোগ্য পাথরের সমাধি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যান্য সমাধির তুলনায় এর খোদাই করা পাথরের কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

কবি হাফিজের সঙ্গে পত্রালাপ

গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ শুধু একজন শাসকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন জ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার পৃষ্ঠপোষক। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজের সঙ্গে তাঁর পত্রালাপ ছিল। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় কবি শাহ মুহম্মদ সগীর ‘ইউসুফ-জোলেখা’ কাব্য রচনা করেন বলেও ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

প্রায় ছয় শতকের ইতিহাসের সাক্ষী

বাংলাপিডিয়ার তথ্যে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধির সময়কাল আনুমানিক ১৪১২ খ্রিস্টাব্দ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে সোনারগাঁ উপজেলা প্রশাসনের পর্যটন তথ্যপৃষ্ঠায় সমাধিটি প্রায় ১৪১০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর কবরের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে উল্লেখ আছে। অর্থাৎ স্থাপনাটি ছয় শতাধিক বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।

শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও সমাধিটি সোনারগাঁয়ের ইতিহাস ও প্রত্নঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে। এর আশপাশের মোগরাপাড়া, শাহচিলাপুর, গোয়ালদীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় মধ্যযুগীয় সোনারগাঁয়ের নানা প্রত্ননিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে।

পর্যটনের সম্ভাবনা, প্রয়োজন সংরক্ষণে নজর

ইতিহাস, স্থাপত্য ও প্রত্নতত্ত্বের দিক থেকে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি সোনারগাঁয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। দেশ-বিদেশের ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে এ ধরনের স্থাপনা বাংলার মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস জানার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।

স্থানীয় ইতিহাসপ্রেমীদের মতে, সমাধি ও আশপাশের প্রত্ননিদর্শনগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ, পরিচর্যা এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক পর্যটন আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।

আজও নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই সমাধি যেন সময়ের কাছে এক প্রশ্ন—ছয় শতাধিক বছরের ইতিহাস বহনকারী এই অমূল্য প্রত্নসম্পদকে আমরা কতটা যত্নে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারব?

সোনারগাঁয়ের প্রাচীন রাজধানীর স্মৃতির সঙ্গে মিশে থাকা গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি তাই কেবল একটি কবর নয়; এটি বাংলার সুলতানি যুগের রাজনৈতিক ইতিহাস, শিল্প-স্থাপত্য ও জ্ঞানচর্চার এক অনন্য স্মারক।