প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সময়: ০৬:৫২ পিএম
নতুন কর্মকর্তা এলেই ফুলের তোড়া কেন?
মোঃ মাইন উদ্দিন :
মানুষকে মূল্যায়ন করা হয় তাঁর সততা, আচার-আচরণ, দায়িত্ববোধ ও কাজের দক্ষতার ভিত্তিতে। দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা, মানুষের প্রতি সম্মান এবং জনকল্যাণে অবদান- এসব গুণের স্বীকৃতি হিসেবে কাউকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো কিংবা সম্মাননা দেওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু সেই স্বীকৃতি যদি কাজের মূল্যায়নের আগেই দেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক- এই ফুলের তোড়া আসলে কিসের প্রতীক?
আমাদের দেশের বিভিন্ন দপ্তরে নতুন কোনো কর্মকর্তা যোগদান করলেই তাঁকে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করার একটি প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই চোখে পড়ছে। কোনো কর্মকর্তা তাঁর নতুন কর্মস্থলে যোগ দিলেন, আর তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে ফুলের তোড়া নিয়ে হাজির হন কিছু ব্যক্তি ও কিছু সংগঠনের প্রতিনিধিরা। সৌজন্য বিনিময় ও নতুন কর্মস্থলে স্বাগত জানানোর অংশ হিসেবে এমন আয়োজনের বিরোধিতা করার কোনো কারণ নেই। তবে প্রশ্ন হলো, একজন কর্মকর্তার কাজ সম্পর্কে জানার আগেই তাঁকে ঘিরে এত আনুষ্ঠানিকতা কেন? তাঁর কর্মদক্ষতা, সততা কিংবা জনসেবার মান যাচাই করার আগেই এই ফুলেল সংবর্ধনার প্রয়োজন কতটা যুক্তিক?
নতুন একজন কর্মকর্তা নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেছেন মানেই তিনি ভালো কাজ করেছেন- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তিনি দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবেন, মানুষের আস্থা অর্জন করবেন এবং তাঁর কাজের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করবেন। দায়িত্ব পালনের শুরুতে তাঁকে স্বাগত জানানো যেতে পারে, কিন্তু প্রকৃত সম্মান অর্জিত হয় কাজের মাধ্যমে, ফুলের তোড়ার সংখ্যার মাধ্যমে নয়।
আমার বিবেচনায়, ফুলের তোড়ার সবচেয়ে অর্থবহ ব্যবহার হতে পারে কোনো কর্মকর্তার কর্মক্ষত্রের সাফল্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে। একজন কর্মকর্তা যদি তাঁর দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠার পরিচয় দেন, সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হন, সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেন এবং অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন, তাহলে তাঁর বিদায়বেলায় ফুলের তোড়া দিয়ে সম্মান জানানো হবে প্রকৃত অর্থে প্রশংসনীয়। তখন সেই ফুলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে মানুষের কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও প্রাপ্তির গল্প।
আর যোগদানের প্রথমেই ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করার পর সেই কর্মকর্তা যদি দায়িত্ব পালনে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হন, তখন প্রাথমিক সংবর্ধনার অর্থ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
অবশ্য নতুন কর্মকর্তা ভবিষ্যতে কেমন কাজ করবেন, তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। তাই তাঁকে আগাম ভালো বা মন্দ হিসেবে চিহ্নিত করাও যুক্তিসংগত নয়। বরং তাঁর কাজ করার পরিবেশ তৈরি করা, দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করা এবং প্রয়োজন হলে গঠনমূলক পরামর্শ দেওয়া উচিত বলে মনে করি আমি।
আরেকটি বিষয় এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন-কাউকে ফুলের তোড়া দেওয়া মানেই তাঁর সঙ্গে কোনো স্বার্থের সম্পর্ক রয়েছে, এমন অভিযোগ তোলার সুযোগ নেই। সৌজন্য, সামাজিক রীতি কিংবা ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা থেকেও মানুষ ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে পারেন। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে, এ আনুষ্ঠানিকতা যেন দায়িত্ব ও কর্মদক্ষতার মূল্যায়নের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়। ফুলের তোড়া যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতার অংশ না হয়ে ওঠে, বরং সম্মান প্রদর্শনের পেছনে যেন থাকে বাস্তব অবদানের স্বীকৃতি।
তাই সচেতন নাগরিক, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের প্রতি আমার বিনীত প্রশ্ন- আমরা কি নতুন কর্মকর্তাকে বরণ করে তাঁর দায়িত্ব, কর্মপরিধি ও জনসেবার অগ্রাধিকার নিয়ে কথা বলতে পারি না? তাঁকে জানাতে পারি না, এ এলাকার মানুষের কি কি সমস্যা রয়েছে, কোথায় সেবার ঘাটতি, কোন বিষয়গুলোতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন? আমাদের এমন উদ্যোগ নতুন কর্মকর্তার জন্যও ইতিবাচক হবে। কারণ, ফুলের তোড়া কিছুক্ষণের জন্য আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু মানুষের সমস্যার সমাধান দীর্ঘস্থায়ী আস্থা তৈরি করে।
আমি ফুলের তোড়ার বিরোধিতা করছি না, বরং ফুলের যথার্থ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কথা বলছি। নতুন কর্মকর্তাকে সৌজন্য জানানো হোক, তবে তাঁর দায়িত্ব পালনে যার যার অবস্থান থেকে সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া হোক। নবাগত অফিসার কাজ করুক, মানুষের কথা শুনুক, সেবার মান উন্নত করুক এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণ হোক। এরপর তাঁর কর্মের মূল্যায়ন হোক- প্রশংসা প্রাপ্য হলে প্রশংসা, সমালোচনার প্রয়োজন হলে গঠনমূলক সমালোচনা।
আমাদের দেশে ফুলের তোড়া দেওয়ার সংস্কৃতি চালু হয়েছে, এবং হতেই পারে, কিন্তু সেই সংস্কৃতির সঙ্গে কাজের মূল্যায়নও যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ, একজন কর্মকর্তার প্রকৃত পরিচয় তাঁর যোগদানে ফুলেল সংবর্ধনায় নয়, বরং দায়িত্ব পালন শেষে মানুষের মনে রেখে যাওয়া অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিতে। যেই কর্মকর্তা মানুষের উপকারে আসেন, তাঁর জন্য ফুলের তোড়া না থাকলেও মানুষের ভালোবাসা থাকে। আর সেই ভালোবাসা যেকোনো আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।