কুলিয়ারচরে ইউএনওর বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের বৈষম্যের অভিযোগ: মতবিনিময় সভা বর্জন

মোঃ মাইন উদ্দিন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে নবযোগদানকৃত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক সাফফাত আরা সাঈদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময়ের ছবি তুলতে বাধা দেওয়া এবং সাংবাদিকেরা চলে যাওয়ার পর অন্যদের ছবি তোলার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভার নোটিশ এক দিন আগের তারিখে জারি এবং সভার মাত্র আড়াই ঘণ্টা আগে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানোর অভিযোগও করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকেরা। এসব ঘটনার প্রতিবাদে ইউএনওর আয়োজিত পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা বর্জন করেছেন কুলিয়ারচরে কর্মরত সাংবাদিকেরা।

স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, গত রোববার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন উপজেলার গোবরিয়া-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা ইউএনওকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে তাঁর কার্যালয়ে যান। এ সময় সেখানে ছয়জন পেশাদার সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। জনপ্রতিনিধিরা ফুলের তোড়া দিতে চাইলে ইউএনও ছবি তোলায় নিষেধাজ্ঞা দেন। ছবি তোলা হলে ফুলের তোড়া গ্রহণ করবেন না বলেও জানান তিনি। পরে সাংবাদিকেরা ছবি না তুলেই কার্যালয় ত্যাগ করেন।
তবে যোগদানের দুই দিন পর মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ইউএনওকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর একাধিক ছবি প্রকাশিত হয়। সাংবাদিকদের দাবি, এর মধ্যে কয়েকটি ছবি তোলা হয় তাঁদের উপস্থিতিতে ছবি তুলতে নিষেধ করার পর এবং তাঁরা কার্যালয় থেকে চলে যাওয়ার পর।

একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির দুই সদস্যের উপস্থিতিতেও। তাঁদের একজনের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুরে লক্ষ্মীপুর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজের শিক্ষকেরা ইউএনওকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে গেলে সাংবাদিকদের উপস্থিতির কারণে ছবি তুলতে নিষেধ করা হয়। পরে উপজেলা প্রশাসন পরিচালিত উপজেলা প্রশাসন স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময়ও একই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ওই দুই সাংবাদিক কার্যালয় থেকে বের হওয়ার প্রায় এক মিনিট পর পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ইউএনওকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে গেলে ছবি তোলায় কোনো বাধা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকেরা। ওই শুভেচ্ছা বিনিময়ের ছবিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

এসব ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তাঁদের প্রশ্ন, একই কার্যালয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ছবি তুলতে আপত্তি থাকলেও তাঁদের চলে যাওয়ার পর ছবি তোলার সুযোগ দেওয়া হলো কেন? এ আচরণের কারণ জানতে চেয়ে তাঁরা প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সমান আচরণ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
এ নিয়ে গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভার নোটিশ পাঠানো হয় বলে জানা গেছে।
নোটিশটি নিয়ে আরও আপত্তি তুলেছেন সাংবাদিকেরা। তাঁদের অভিযোগ, সাংবাদিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আগে কোনো আলোচনা না করেই সভার নোটিশ তৈরি করা হয়। নোটিশের অনুলিপি কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিবের কাছে পাঠানো হয়।

সাংবাদিকদের দাবি, ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টা ৬ মিনিটে উপজেলা পরিষদের কর্মী মোঃ ওবায়দুল্লাহ সুজনের মোবাইল ফোন থেকে কুলিয়ারচরের সাংবাদিকদের দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নোটিশটি পাঠানো হয়। তবে নোটিশে ২৯ সেপ্টেম্বর তারিখ উল্লেখ ছিল। এতে স্মারক নং দেওয়া হয় ০৫.৪১,৪৮৫৪,০০০,০০,০৪৮.২৫-৬৪২ (২৫)। সভা শুরুর মাত্র আড়াই ঘণ্টা আগে নোটিশ পাঠানোয় অধিকাংশ সাংবাদিক যথাসময়ে বিষয়টি জানার সুযোগ পাননি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

নোটিশে আগের দিনের তারিখ উল্লেখ করার কারণ এবং সভা আয়োজনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে সাংবাদিকেরা এটিকে বিভ্রান্তিকর বলে অভিহিত করেন। তাঁদের অভিযোগ, নোটিশের তারিখ ও পাঠানোর সময়ের এই অসংগতি সম্পর্কে প্রশাসনের ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এর প্রতিবাদে তাঁরা পরিচিতি ও মতবিনিময় সভায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

স্থানীয় সাংবাদিকদের ভাষ্য, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পেশাগত স্বাধীনতা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহের ভিত্তিতে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ কিংবা সভার নোটিশ দেওয়ার ক্ষেত্রে অসংগতি থাকলে তা প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তাঁরা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।