ছানি চিকিৎসায় দীর্ঘ অপেক্ষা, অন্ধত্বের ঝুঁকিতে ১০ লাখ মানুষ

দেশে চিকিৎসাযোগ্য অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে চোখের ছানি। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ছানি অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। অথচ বিপুলসংখ্যক রোগীর তুলনায় ছানি অস্ত্রোপচারে দক্ষ সার্জনের সংখ্যা অপ্রতুল। ফলে চিকিৎসায় দেরি হওয়ায় অনেকের দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে নিবন্ধিত চক্ষু বিশেষজ্ঞের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হলেও ছানি অস্ত্রোপচারে সক্রিয় ও অভিজ্ঞ সার্জনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। বিভিন্ন হিসাবে দক্ষ সার্জনের সংখ্যা ৪০০ থেকে ২ হাজার ২০০-এর মধ্যে। অন্যদিকে প্রতি বছর নতুন করে এক লাখের বেশি মানুষ ছানির রোগী হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা দ্রুত কমানো কঠিন হবে।

চিকিৎসকদের মতে, দক্ষ সার্জনের ঘাটতির পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতা, রোগ শনাক্তকরণে দুর্বলতা, চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং নারী-পুরুষের চিকিৎসা পাওয়ার বৈষম্য ছানি চিকিৎসার বড় বাধা। বিশেষ করে গ্রামীণ ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নানা কারণে সময়মতো অস্ত্রোপচার করাতে পারেন না।

বিশ্ব দৃষ্টি দিবস উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা চোখের যত্নে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এবারের প্রতিপাদ্য ‘লাভ ইউর আইস’—অর্থাৎ চোখকে ভালোবাসুন। চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী চশমা ব্যবহার এবং ছানি শনাক্ত হলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই দৃষ্টিশক্তি হারানো ঠেকানো সম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ছানিজনিত অন্ধত্বের দীর্ঘ অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বছরে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ ছানি অস্ত্রোপচারের সক্ষমতা থাকলেও নতুন রোগী যুক্ত হওয়ায় ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

তার মতে, আগামী পাঁচ বছরে প্রতিবছর অতিরিক্ত অন্তত দুই লাখ ছানি অস্ত্রোপচার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা থেকে বের হয়ে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবল বাড়াতে হবে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। ২৫০ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়ে এত বিপুল রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৩০ জনের ছানি অস্ত্রোপচার করা হয়। প্রয়োজনীয় লেন্সও রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. রেজওয়ানুর রহমান বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া অনেকেই স্বাভাবিক বিষয় মনে করেন। কিন্তু ছানি হলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক বা স্পষ্ট দৃষ্টি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তিনি জানান, চোখের প্রাকৃতিক লেন্স ঘোলা হয়ে গেলে সাধারণত দৃষ্টি ঝাপসা বা কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে যায়। তীব্র আলো কিংবা গাড়ির হেডলাইটের সামনে দেখতে সমস্যা হওয়াও ছানির অন্যতম লক্ষণ।

চিকিৎসকদের মতে, ছানি রোগীদের বড় অংশ বয়স্ক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর। হাসপাতালে যাতায়াতের খরচ, সঙ্গে কাউকে নেওয়ার প্রয়োজন এবং চিকিৎসা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় অনেকেই অস্ত্রোপচার থেকে পিছিয়ে থাকেন। নারীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি।

দেশের আট জেলায় ২১ হাজার ৫৯৬ জনের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ছানি অস্ত্রোপচারের হার পুরুষদের মধ্যে ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ।


জাতীয় অন্ধত্ব জরিপ-২০২০ অনুযায়ী, দেশে ৩০ বছর ও তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে অন্ধত্বের হার প্রায় ১ শতাংশ। এ বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রতি ১০০ জনের প্রায় পাঁচজন কোনো না কোনো ধরনের দৃষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগছেন। আনুমানিক ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৭৩ জন অন্ধত্ব নিয়ে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ ছানিজনিত অন্ধত্বে আক্রান্ত।

২০০০ সালের জরিপে বয়স ও লিঙ্গ সমন্বয় করা অন্ধত্বের হার ছিল ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০২০ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ শতাংশে। অর্থাৎ দুই দশকে দেশে অন্ধত্বের হার প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। তবে চিকিৎসাযোগ্য অন্ধত্বের বোঝা এখনও বড় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


শুধু ছানি নয়, প্রয়োজনীয় চশমা না পাওয়ার কারণেও দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ দৃষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগছেন। প্রায় ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের কোনো না কোনো ধরনের দৃষ্টিত্রুটি থাকলেও চশমা ব্যবহারের সুযোগ পান মাত্র ২৬ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে চালসে, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি ও গ্লুকোমার মতো চোখের রোগের ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে শিশু ও কর্মজীবীদের মধ্যেও অনেক সময় দৃষ্টিজনিত সমস্যা সময়মতো শনাক্ত হয় না।

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা বলেন, গত দুই দশকে দেশে অন্ধত্ব প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে এবং বেসরকারি পর্যায়ে তুলনামূলক কম খরচে ছানি অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন ধরনের চোখের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।