পর্ব- ০৫:পুরান ঢাকার চকবাজার ও নিমতলী ট্র্যাজেডির ক্ষত এখনো শুকায়নি। সংকীর্ণ রাস্তা আর নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বহুতল ভবন নির্মাণের খেসারত বারবার দিতে হয়েছে পুরান ঢাকাবাসীকে। এর মধ্যেই রাজউকের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা উপেক্ষা করে রাজধানী শহর ঢাকার লালবাগে গড়ে উঠছে আরও একটি ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবন।
সরেজমিনে লালবাগের জে.এন. সাহা রোড এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অত্যন্ত ঘিঞ্জি এবং মাত্র ৭ ফুট চওড়া একটি গলির ভেতরে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। মাত্র ১১৫০ বর্গফুট জায়গায় আট তলা ভবনের পরিকল্পনা নিয়ে ইতিমধ্যে রাজউকের চোখ ফাঁকি দিয়ে ভবনটির পাঁচ তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ভবনটির চারপাশ থেকে নামমাত্র কিছু জায়গা খালি রাখা হলেও, তা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী সম্পূর্ণ অপর্যাপ্ত।
সংশ্লিষ্ট রাজউক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের অনুমোদিত “বিস্তারিত এলাকা পরিকল্পনা” (ড্যাপ) এবং “ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা” অনুযায়ী, যেকোনো ভবন নির্মাণের জন্য রাস্তার প্রশস্ততা এবং প্লটের আয়তনের ওপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ মেঝে এলাকা অনুপাত (ঋঅজ) ও সেটব্যাক (জায়গা ছাড়ার নিয়ম) নির্ধারিত হয়। ৭ ফুটের মতো সরু রাস্তার পাশে আট তলা (এ+৭) ভবন নির্মাণের অনুমোদন পাওয়া আইনি ও কারিগরিভাবে অসম্ভব। ফলে নির্মাণাধীন এই ভবনের ৫ম তলার ছাদ এবং পরবর্তী তলাগুলোর বর্ধিতকরণ সম্পূর্ণ অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সাত ফুট গলিতে সাধারণ মানুষের চলাচলই কঠিন। এখানে আট তলা ভবন হলে যদি কখনো আগুন লাগে বা ভূমিকম্প হয়, তবে পুরো গলি মানুষের লাশের স্তূপে পরিণত হবে। ফায়ার সার্ভিসের একটা ছোট গাড়ি ঢোকারও তো জায়গা নেই।” বাংলাদেশ জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (ইঘইঈ) অনুযায়ী, যেকোনো বহুতল বা উচ্চ-ঝুঁকিসম্পন্ন ভবনের আশপাশে জরুরি উদ্ধারকারী যান (যেমন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি) চলাচলের ন্যূনতম সুবিধা থাকা বাধ্যতামূলক, যা এই সরু গলিতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, “ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২” অনুযায়ী, রাজধানী উন্নয়ন করপোরেশন (রাজউক) এর লিখিত অনুমোদন এবং অনুমোদিত নকশা ছাড়া যেকোনো ধরনের ভবন নির্মাণ বা নকশার গুরুতর ব্যত্যয় ঘটানো দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনের আওতায় অবৈধ নির্মাণ উচ্ছেদ, কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এলাকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা এড়াতে রাজউক অবিলম্বে এই অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালাবে নাকি আরও একটি ট্র্যাজেডির অপেক্ষা করবে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।