প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬
সময়: ০৮:৫৮ পিএম
মাদকসেবী বাবার কাণ্ড! নিজ শিশুকে আছাড় মেরে হত্যা: আমরা কোন সমাজে বাস করছি?
মোঃ মাইন উদ্দিন :
সাত মাসেরএকটি শিশু। পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা বোঝার মতো বয়স তার হয়নি। কথা বলতে পারে না, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষমতা নেই। মায়ের কোলই ছিল তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। অথচ সেই মায়ের কোল থেকেই তাকে ছিনিয়ে নিয়ে মাথার ওপর থেকে মাটিতে আছড়ে ফেলা হলো। একবার নয়, পরপর দুইবার। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানল নিষ্পাপ শিশুটি।
নির্মম এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের সমাজের গভীরতর অসুস্থতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, পারিবারিক কলহের একপর্যায়ে শিশুটির বাবা মায়ের কোল থেকে সাত মাস বয়সী রাফা মনিকে ছিনিয়ে নিয়ে মাটিতে আছড়ে ফেলছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অভিযোগ উঠেছে, শিশুটির বাবা নিয়মিত কাজ করতেন না এবং মাদকাসক্ত ছিলেন। পারিবারিক কলহের সঙ্গে মাদকের সংশ্লিষ্টতাও তদন্তে উঠে এসেছে।
এখানে প্রথম যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হলো, একজন বাবা কীভাবে নিজের সন্তানের প্রতি এমন নির্মম হতে পারে?
মানুষের রাগ হতে পারে, ক্ষোভ হতে পারে, দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভের লক্ষ্য যখন হয়ে ওঠে একটি অসহায় শিশু, তখন বিষয়টি আর নিছক পারিবারিক ঝগড়া থাকে না। এটি হয়ে ওঠে ভয়াবহ অপরাধ এবং মানবিকতার চরম পতন।
আমাদের সমাজে মাদককে অনেক সময় কেবল একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। অথচ মাদকাসক্তি কেবল একজন মানুষকে ধ্বংস করে না- ধ্বংস করে একটি পরিবার, ধ্বংস করে সমাজ, বিপন্ন করে শিশুদের ভবিষ্যৎ এবং কখনো কখনো কেড়ে নেয় নিরপরাধ মানুষের জীবন। মাদকের প্রভাবে একজন মানুষ তার বিবেক, সংযম ও দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলতে পারেন- এ কথা নতুন নয়। কিন্তু যখন সেই মানুষটি পরিবারের অভ্যন্তরে থাকে, তখন বিপদ আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
মাদকাসক্ত স্বামী বা পরিবারের কোনো সদস্যের সহিংস আচরণের সবচেয়ে বড় শিকার হন নারী ও শিশুরা। অনেক পরিবার সামাজিক লজ্জা, অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব কিংবা সংসার টিকিয়ে রাখার অজুহাতে বছরের পর বছর নির্যাতন সহ্য করে। প্রতিবেশীরা জানেন, আত্মীয়রা জানেন, কখনো কখনো স্থানীয় লোকজনও জানেন কিন্তু সক্রিয়ভাবে কেউ এগিয়ে আসেন না। যতক্ষণ না কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটে, ততক্ষণ সবাই যেন অপেক্ষা করেন।
এই নীরবতাও কি আমাদের দায়মুক্ত করে?
একটি শিশুকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আছড়ে ফেলার মতো ঘটনা হঠাৎ করে সৃষ্টি হয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি, মাদকাসক্তি, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মানসিক অস্থিতিশীলতা এবং সামাজিক উদাসীনতা। পরিবারের সদস্যরা যদি আগে থেকেই বুঝতে পারেন যে একজন ব্যক্তি মাদকের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন, তার আচরণ সহিংস হয়ে উঠছে, তখন বিষয়টি গোপন না রেখে যথাযথ সহায়তা নেওয়া জরুরি।
আমাদের আরেকটি সমস্যা হলো, মাদকাসক্তিকে আমরা কখনো কখনো অভ্যাস বলে পাশ কাটিয়ে যাই। অথচ মাদকাসক্তি একটি গুরুতর সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা, যার সঙ্গে অপরাধ, সহিংসতা ও পারিবারিক বিপর্যয়ের সম্পর্ক রয়েছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তার সহিংস আচরণ থেকে পরিবারকে সুরক্ষিত রাখাও জরুরি।
বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা যায় না। একটি শিশু কোনো পারিবারিক বিরোধের পক্ষ নয়। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার দায় তার নয়। প্রাপ্তবয়স্কদের রাগ, ক্ষোভ বা ব্যর্থতার মূল্য কোনো শিশুকে জীবন দিয়ে দিতে হবে- এমন সমাজ আমরা চাই না।
এই ঘটনাটি আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। শুনেছি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিশু হত্যার মতো অপরাধে বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে গেলে সমাজে ভুল বার্তা যায়। মানুষ মনে করতে শুরু করে, অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব।
তবে কেবল কঠোর আইনই সমস্যার সমাধান নয়। মাদকবিরোধী অভিযানকে আরও কার্যকর করতে হবে। মাদকের সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের জন্য সহজলভ্য ও কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আমাদের সমাজের। কোনো পরিবারে নিয়মিত মারামারি, মাদকাসক্তি বা সহিংসতার ঘটনা ঘটলে সেটিকে তাদের পারিবারিক ব্যাপার বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একটি পরিবারের ভেতরের সহিংসতা কখন যে একটি শিশুর জীবন কেড়ে নেবে, তা কেউ জানে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটির ওপর নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে, নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো: আমরা কি শুধু ভিডিও দেখে ক্ষুব্ধ হব? কয়েক দিন পর সব ভুলে যাব? নাকি এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব নতুন করে নির্ধারণ করব?
একটি সাত মাসের শিশুর মৃত্যু আমাদের বিবেকের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে, একজন বাবা কীভাবে নিজের সন্তানের বিরুদ্ধে এমন ভয়াবহ সহিংসতা চালাতে পারলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধে খুঁজলে চলবে না। এর উত্তর খুঁজতে হবে মাদকের বিস্তার, পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক নীরবতা, মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির মধ্যেও।
একটি শিশুর মৃত্যু যেন কেবল ভাইরাল ঘটনা হয়ে না থাকে। রাফা মনির মৃত্যু আমাদের চোখে দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে- পরিবারের ভেতরের সহিংসতা কখনোই ব্যক্তিগত বিষয় নয়, আর মাদকাসক্তির আগ্রাসনকে অবহেলা করার মূল্য কখনো কখনো একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন দিয়ে দিতে হয়।
সময় এসেছে মাদক, পারিবারিক সহিংসতা ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে দাঁড়ানোর। কারণ একটি শিশুকে রক্ষা করতে ব্যর্থ সমাজ কখনোই সত্যিকার অর্থে সভ্য সমাজ হতে পারে না।