নোয়াখালীতে স্বাভাবিক প্রসবে নজির, ৬ মাসে ৯৮ শতাংশ মা পেলেন অস্ত্রোপচার ছাড়াই সন্তান

নিজস্ব প্রতিবেদক: 

নোয়াখালীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসবসেবায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এ কেন্দ্রে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ২৯৭ জন গর্ভবতী নারীর মধ্যে ১ হাজার ২৭৪ জনই অস্ত্রোপচার ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। মাত্র ২৩ জনের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান অপারেশনের প্রয়োজন হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৯৮ শতাংশ প্রসবই হয়েছে স্বাভাবিকভাবে।

২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন নানা সংকট ও জনবলস্বল্পতায় কার্যক্রমে পিছিয়ে পড়েছিল। একসময় ২০১৬ সালে এখানে প্রসবের সংখ্যা শূন্যে নেমে আসে। তবে ২০২১ সালে চিকিৎসক ডা. মুহাম্মদ জিহাদুল হক প্রশাসনিক দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে আমূল পরিবর্তন আসে। এরপর থেকেই নিরাপদ মাতৃসেবায় সুনাম অর্জন করতে শুরু করে কেন্দ্রটি।

বর্তমানে এখানে প্রসবপূর্ব, প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী চিকিৎসাসেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নোয়াখালীর পাশাপাশি পাশের লক্ষ্মীপুর থেকেও বহু রোগী এই কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসছেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বাভাবিক প্রসব হয়েছিল ৩১৪টি। ২০২১-২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭৫টিতে। ২০২২-২৩ সালে ১ হাজার ৪২৩টি এবং ২০২৩-২৪ সালে ২ হাজার ৯৮টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়। চলতি বছরের জুলাই মাসের প্রথম ১৫ দিনেই আরও ১৬০টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে।

সেবাগ্রহীতাদের ভাষ্য, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন এড়িয়ে নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করায় প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে। নোয়াখালী সদর উপজেলার বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন জানান, তাঁর স্ত্রী, বোন ও ভাগনি—তিনজনই এখানে স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। সেবার মানে তিনি সন্তুষ্ট।

আরেক সেবাগ্রহীতার স্বজন সালমা আক্তার বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের আশঙ্কায় তিনি পুত্রবধূকে এই কেন্দ্রে ভর্তি করেছিলেন। সেখানে সফলভাবে স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে এবং মা ও নবজাতক দুজনই সুস্থ আছেন।

তবে সাফল্যের পাশাপাশি রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। প্রতিষ্ঠানে মেডিক্যাল অফিসার (ক্লিনিক) পদটি শূন্য। বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন। অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও জ্বালানির জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহের ঘাটতির কারণে অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়।

নোয়াখালী মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. মুহাম্মদ জিহাদুল হক বলেন, "সীমিত জনবল ও সম্পদ নিয়েও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যাতে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করা যায়। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান কোনোভাবেই করা হয় না।"

তিনি আরও বলেন, জাতীয় পর্যায়ে দেশসেরা স্বীকৃতি পাওয়া তাঁদের জন্য অনুপ্রেরণা হলেও জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর হলে আরও বেশি মা ও শিশুকে উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক আবুল কাশেম মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, দরিদ্র মানুষ যাতে ঘরে ঝুঁকিপূর্ণ প্রসব না করিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ প্রসবসেবা নেন, সেটিই সরকারের লক্ষ্য। তিনি জানান, ডা. জিহাদুল হক ও তাঁর দলের এই সাফল্য নোয়াখালীর জন্য গর্বের এবং নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ।