‘নীরব ঘাতক’ রদ্রি যেভাবে বিশ্বকাপ–সেরা
২০২৪ সালে ব্যালন ডি’অর জয়ের পর থেকেই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন রদ্রি। অনেকের মতে, সেই পুরস্কারটি পাওয়ার কথা ছিল ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের। ক্ষোভে প্যারিসে ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে অংশই নেয়নি রিয়াল মাদ্রিদ। তবে এক বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের পারফরম্যান্স দিয়েই সব বিতর্কের জবাব দিলেন স্পেনের এই মিডফিল্ডার।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেন যখন দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতল, তখন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি গোল্ডেন বল উঠল রদ্রির হাতেই। ব্যালন ডি’অরের পর বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে তিনি প্রমাণ করলেন, আধুনিক ফুটবলে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের শিল্পে তাঁর মতো কার্যকর মিডফিল্ডার খুব কমই আছেন।
এই অর্জনের মাধ্যমে রদ্রি ইতিহাসের মাত্র একাদশ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপ, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ব্যালন ডি’অর—এই তিনটি মর্যাদাপূর্ণ শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করলেন। পাশাপাশি পাওলো রসি, জিনেদিন জিদান ও লিওনেল মেসির পর মাত্র চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, ব্যালন ডি’অর এবং বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল—চারটি ট্রফিই নিজের করে নিলেন।
গোল কিংবা অ্যাসিস্টের হিসেবে রদ্রির নাম খুব বেশি চোখে পড়ে না। পুরো বিশ্বকাপেই তিনি কোনো গোল করেননি, কোনো অ্যাসিস্টও করেননি। কিন্তু ফুটবলে সব অবদান স্কোরশিটে ধরা পড়ে না—রদ্রি তারই সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
বল দখল ধরে রাখা, নিখুঁত পাস, অসাধারণ পজিশনিং, প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়া এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ—এই প্রতিটি জায়গায় স্পেনের মূল ভরসা ছিলেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি সফল পাস, সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম এবং সবচেয়ে বেশি বল স্পর্শ করার কৃতিত্ব ছিল তাঁর।
ফাইনালেও সেই আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলের পেছনে মাঝমাঠে ছন্দ তৈরি করেছিলেন রদ্রি। পুরো ম্যাচে তিনি ১০৬টি পাসের মধ্যে ১০১টি সফল করেন, যা প্রায় ৯৫ শতাংশ সফলতার হার। দীর্ঘ পাসেও ছিল প্রায় নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ।
তবে এই সাফল্যের পথ সহজ ছিল না। ২০২৪ সালে গুরুতর চোটে তাঁর ক্যারিয়ারই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যায়। কিন্তু কঠিন পুনর্বাসন শেষে তিনি ফিরে আসেন আরও পরিণত হয়ে। ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা বলেছিলেন, "বিশ্বকাপে আমরা রদ্রির সেরা সংস্করণ দেখব।" শেষ পর্যন্ত সেই ভবিষ্যদ্বাণীই সত্যি হয়েছে।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে স্পেনের মিডফিল্ডকে প্রায় একাই নিয়ন্ত্রণ করেন রদ্রি। তাঁর প্রেসিং, পজিশনিং ও বল পুনরুদ্ধারের দক্ষতার কারণে পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা কার্যকর কোনো আক্রমণই গড়ে তুলতে পারেনি। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষেও একইভাবে মাঝমাঠ শাসন করেছিলেন তিনি।
রদ্রির সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর নীরবতা। মাঠে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নন, কিন্তু খেলার নিয়ন্ত্রণ থাকে তাঁর পায়ে। কখন আক্রমণ হবে, কখন গতি কমবে, কখন প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে হবে—সবকিছুই তিনি পরিচালনা করেন নিখুঁতভাবে।
ফিফার ফুটবল পারফরম্যান্স ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, পুরো বিশ্বকাপে কাউন্টার-প্রেসিংয়ের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি বল পুনরুদ্ধার করেছেন রদ্রিই। বল হারানোর পর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সবার সেরা।
ফাইনালের পর আবেগাপ্লুত রদ্রি বলেন, "এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন মেঘের ওপর ভাসছি। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।"
বিশ্বকাপ জয়ের উচ্ছ্বাসে হয়তো সবচেয়ে বেশি আলো কেড়েছেন গোলদাতা ফেরান তোরেস কিংবা তরুণ তারকারা। কিন্তু স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের ভিতটা যে গড়ে দিয়েছেন রদ্রি, সে বিষয়ে দ্বিমত করার সুযোগ খুব কম। কারণ, তিনি এমন এক ফুটবলার, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় খেলা শেষ হওয়ার পর।