প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬
সময়: ০৮:২৯ পিএম
আর্জেন্টিনার হার, স্পেনের যোগ্যতার জয়
মোঃ মাইন উদ্দিন :
ফুটবল কখনো কখনো শুধু আবেগের খেলা নয় এটি কৌশল, পরিকল্পনা, মানসিক দৃঢ়তা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ারও খেলা। বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরাজয় তাই শুধু একজন সমর্থকের হৃদয় ভাঙেনি, বরং দলটির কৌশল ও খেলার ধরন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আর্জেন্টিনা ০-১ গোলে স্পেনের কাছে হেরে বিশ্বকাপের শিরোপা হাতছাড়া করেছে। আমি আর্জেন্টিনার একজন সমর্থক হিসেবে এই পরাজয় নিঃসন্দেহে কষ্টের। কিন্তু আবেগের বাইরে দাঁড়িয়ে ম্যাচটি বিশ্লেষণ করলে স্বীকার করতেই হবে- স্পেন এই বিশ্বকাপের যোগ্য চ্যাম্পিয়ন।
ফাইনালে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল আক্রমণে। পুরো ম্যাচে দলটি স্পেনের গোলরক্ষককে কার্যকরভাবে পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি। এমনকি গোলমুখে একটি কার্যকর শটও নিতে না পারা বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো ম্যাচে অত্যন্ত হতাশাজনক। বিপরীতে স্পেন শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ, পাসিং এবং আক্রমণের ধারাবাহিকতার মাধ্যমে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিল।
আর্জেন্টিনা যে দলটি পুরো টুর্নামেন্টে শক্তিশালী ফুটবল খেলেছে, কঠিন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করেছে- ফাইনালে সেই আর্জেন্টিনাকে দেখা যায়নি। দলটি যেন নিজেদের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক ফুটবল ভুলে অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে পড়েছিল।
এখানেই কোচ লিওনেল স্কালোনির কৌশল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে প্রতিপক্ষের শক্তি বিবেচনা করে রক্ষণাত্মক কৌশল নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক মানসিকতা যখন দলের আক্রমণকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়, তখন সেটি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। আমার দৃষ্টিতে, আর্জেন্টিনার অতিরিক্ত ডিফেন্সিভ প্লেয়িং স্টাইলই ফাইনালে পরাজয়ের অন্যতম কারণ।
ফুটবলে রক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু প্রতিপক্ষকে ঠেকিয়ে রেখে চ্যাম্পিয়ন হওয়া যায় না। গোল করতে হয়, সুযোগ তৈরি করতে হয়, প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হয়। আর্জেন্টিনা সেই জায়গাতেই পিছিয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে স্পেন ছিল পরিকল্পনায় পরিষ্কার এবং খেলায় আত্মবিশ্বাসী। তারা বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, আক্রমণের সুযোগ তৈরি করেছে এবং ধৈর্য ধরে নিজেদের খেলার ধরন বজায় রেখেছে। আর্জেন্টিনা যতই রক্ষণে মনোযোগী হয়েছে, স্পেন ততই ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত স্পেনের সেই ধারাবাহিকতা ও আধিপত্যই তাদের বিশ্বকাপের শিরোপা এনে দিয়েছে।
আর্জেন্টিনার জন্য এই পরাজয় অবশ্যই বেদনাদায়ক। বিশেষ করে মেসির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই প্রজন্মের জন্য বিশ্বকাপের ফাইনালে হার নিঃসন্দেহে হতাশার। তবে একটি ফাইনালে হার কোনোভাবেই আর্জেন্টিনার সামগ্রিক সাফল্যকে মুছে দিতে পারে না।
মেসি ও তার প্রজন্ম আর্জেন্টিনাকে দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিশ্বকাপ এনে দিয়েছে। কোচ স্কালোনিও দলটিকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী শক্তিতে পরিণত করেছেন। তাই এই পরাজয়কে ব্যর্থতার চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে পরাজয় থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ অবশ্যই আছে। বড় ম্যাচে শুধু রক্ষণ নয়, আক্রমণাত্মক সাহসও প্রয়োজন। প্রতিপক্ষকে সম্মান করতে হয়, কিন্তু অতিরিক্ত ভয় পাওয়া যায় না। কারণ বিশ্বকাপের ফাইনালে অনেক সময় একটি সিদ্ধান্ত, একটি কৌশল কিংবা আক্রমণে সামান্য সাহসই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
আর্জেন্টিনা আমার প্রিয় দল। তাই তাদের হার কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু ভালোবাসা কখনো সত্যকে অস্বীকার করার কারণ হতে পারে না।
বাস্তবতা হলো, এই ফাইনালে স্পেন আর্জেন্টিনার চেয়ে ভালো খেলেছে। তারা বেশি সংগঠিত ছিল, বেশি নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো ফুটবল খেলেছে।
আর্জেন্টিনার পরাজয় আমার কষ্টের কারণ হতে পারে, কিন্তু স্পেনের চ্যাম্পিয়ন হওয়া মেনে নিতে কোনো দ্বিধা নেই। কারণ বাস্তবতা হলো, স্পেন যোগ্য দল হিসেবেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে।