যশোরের মণিরামপুরে সাংবাদিকদের দুটি সংগঠনকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মণিরামপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি এস এম মনজুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাত, অতীতের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং তথ্য যাচাই না করে অন্য সাংবাদিক সংগঠনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগ তুলেছেন মণিরামপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ।
সম্প্রতি নিবন্ধনহীন ফেসবুক পেজ 'রাতদিন নিউজ'-এ দেওয়া বক্তব্যে এস এম মনজুর রহমান দাবি করেন, যুবলীগ নেতার নিয়ন্ত্রণাধীন উপজেলা প্রেসক্লাবের নাম পরিবর্তন করে ৫ আগস্টের পর মণিরামপুর রিপোর্টার্স ক্লাব করা হয়েছে। তবে এ বক্তব্যকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন রিপোর্টার্স ক্লাবের নেতৃবৃন্দ।
তাঁদের দাবি, উপজেলা প্রেসক্লাবের আত্মপ্রকাশের আগেই মণিরামপুর রিপোর্টার্স ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তাই ইতিহাস না জেনে কিংবা তথ্য যাচাই না করে এমন বক্তব্য দেওয়া দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিচয় বহন করে না বলে মনে করেন তাঁরা।
এদিকে প্রেসক্লাব সভাপতি এস এম মনজুর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন রিপোর্টার্স ক্লাবের কয়েকজন সদস্য। তাঁদের অভিযোগ, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহজালালকে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়ে আসছেন তিনি। পাশাপাশি সাবেক সংসদ সদস্য ইয়াকুব আলীর ছোট ভাই মেহেদী হাসানের দেওয়া অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার সঙ্গেও মণিরামপুর প্রেসক্লাব ও শাহজালালের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নির্বাচনের আগে মেহেদী হাসান মণিরামপুরবাসীর জন্য অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর ভাই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর একটি অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে সেটির পরিচালনায় কারা যুক্ত এবং এর ব্যবস্থাপনায় কোনো রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে কি না, তা জনসমক্ষে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
রিপোর্টার্স ক্লাবের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, সাংবাদিক সংগঠন কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন নয়। এখানে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সাংবাদিকেরা পেশাগত পরিচয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারেন। অথচ একটি সংগঠনকে রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করে অন্য সংগঠনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তাঁরা আরও অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছর মণিরামপুর প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের অনেকের সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল। প্রেসক্লাবের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সভাপতির বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগের রাজনীতি এবং সাবেক সংসদ সদস্যের নির্বাচনী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের প্রশ্ন, অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা না করে শুধু রিপোর্টার্স ক্লাবকে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা কেন?
এ ছাড়া প্রেসক্লাব সভাপতি এস এম মনজুর রহমানের বিরুদ্ধে শিক্ষকতার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সময় কাটানোর অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন ব্যক্তি। এ নিয়ে একপর্যায়ে দুর্গাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
এস এম তাজামুল নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে মনজুর রহমানের বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনাও সামনে এনেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, সরকারি দপ্তরে অবস্থানকালে ক্লাসের সময় নিয়ে প্রশ্ন করায় তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। তবে এ ঘটনারও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রিপোর্টার্স ক্লাবের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরে সংশ্লিষ্টরা জানান, যুবলীগ নেতা এস এম লুৎফর রহমান, প্রতিষ্ঠাতা সুমন চক্রবর্তী, রাশেদ আলী ও টিপু সুলতানসহ কয়েকজনের উদ্যোগে সংগঠনটির কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে চাপ ও হুমকির মুখে উপজেলা প্রেসক্লাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল মামুনের রাজনৈতিক পরিচয় প্রসঙ্গে জানানো হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহযোগী সংগঠন ইসলামী যুব আন্দোলনের মণিরামপুর পৌর শাখার সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা ইসলামী যুব আন্দোলনের প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
রিপোর্টার্স ক্লাবের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, সাংবাদিকতার সঙ্গে ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়কে এক করে দেখা উচিত নয়। বরং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বক্তব্য দেওয়া এবং পেশাগত শিষ্টাচার বজায় রাখা জরুরি।
তাঁদের প্রশ্ন, একটি সাংবাদিক সংগঠনের সভাপতির দায়িত্বে থেকে অন্য সংগঠন ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার আগে তথ্য যাচাই করা কি তাঁর নৈতিক দায়িত্ব নয়?
এ বিষয়ে এস এম মনজুর রহমান, মণিরামপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সভাপতির বক্তব্য পাওয়া গেলে তা-ও প্রকাশ করা হবে। দুই সংগঠনকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগে মণিরামপুরের সাংবাদিক মহলে আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।