দুই হাজার চব্বিশ সালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। আন্দোলনকারীদের ভাষায়, এর মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে নতুন এক স্বাধীনতা- জুলাইয়ের স্বাধীনতা। সময় যত গড়িয়েছে, ততই সামনে এসেছে এ পরিবর্তনের নানা সুফল ও কুফলের চিত্র। নতুন স্বাধীনতার নামে কেউ কেউ মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন, কেউ চাইছেন জুলাই যোদ্ধা সনদের বাস্তবায়ন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আজ যাঁরা মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিরোধিতা করছেন, মুক্তিযুদ্ধের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করছেন, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক কিংবা পুলিশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন, তাঁরা কি হঠাৎ করে তৈরি হয়েছেন?
তাঁরা তো এ সমাজেরই মানুষ। আমাদের আশপাশে ছিলেন, আমাদের সঙ্গে চলেছেন, কথা বলেছেন, সামাজিক ও পারিবারিক নানা সম্পর্কেও যুক্ত ছিলেন। এতদিন আমরা তাঁদের চিন্তা, বিশ্বাস ও মানসিকতার অনেক কিছুই হয়তো বুঝতে পারিনি। তাই হঠাৎ বদলে যাওয়া চেনা মুখগুলোর অচেনা চরিত্র দেখে বিস্মিত হতে হয়। ভাবতে হয়, একজন মানুষ কীভাবে এত দীর্ঘ সময় নিজের প্রকৃত চিন্তা ও অবস্থান আড়াল করে রাখতে পারেন! তবে তাঁদেরকে ধন্যবাদ দিতে হয়, এতদিন তাঁরা নিজেদের চিন্তা ও চরিত্র গোপন রাখতে পেরেছেন। যা চব্বিশের পর তাঁদের অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট হচ্ছে।
আমাদের দেশে রাজনীতি আগেও ছিল, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন মত, ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসও একটি সমাজে থাকবেই। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার বিরোধিতা, মুক্তিযুদ্ধের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান, কবি-সাহিত্যিক ও সাংবাদিক ও পুলিশের প্রতি বিদ্বেষ কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর মানসিকতা কোথা থেকে এলো- সেটি নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। তাঁরা কারা, কোথা থেকে এলেন, এতদিন কোথায় ছিলেন, তাঁদের চিন্তার উৎস কি- এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন রাষ্ট্রের জন্য জরুরি। কারণ একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এমন মানসিকতা একদিনে তৈরি হয় না। এর পেছনে কোনো না কোনো পরিবেশ, প্রভাব, শিক্ষা বা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রক্রিয়া কাজ করছে। তাই বিষয়টি শুধু সরকারের নয়, সমাজের সচেতন মানুষেরও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
আবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ভয়ংকর এক প্রবণতা- মব সন্ত্রাস। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাস্তা থেকে স্টেশন, দোকান থেকে জনসমাগমস্থল- কোথাও যেন মানুষ মবের হাত থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। এমনকি দেশের বাইরেও মবের ঘটনা ঘটনার খবর সামনে আসছে। এমনকি আদালত চত্বরও এর বাইরে না। তাহলে প্রশ্ন উঠবে- আইন-আদালতের প্রয়োজন কোথায়? আইন মানে, কেউ অপরাধ করলে তদন্ত হবে, আদালতে বিচার হবে, আদালত দোষী সাব্যস্ত করলে শাস্তি হবে এটাই সভ্য রাষ্ট্রের নিয়ম। কিন্তু আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়া কোনো ব্যক্তিও যদি মবের শিকার হয়, জনতার হাতে হেনস্তা বা আক্রমণের শিকার হন, তাহলে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা কোথায় থাকবে? মব সন্ত্রাস কোনো ব্যক্তি বা দলের জন্য একক সমস্যা নয়- এটি রাষ্ট্র এবং সমাজের জন্য ভয়ংকর হুমকি। আজ যে মব অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে, কাল সেটি নিজের বিরুদ্ধে ফিরে আসবে না- এর কোনো নিশ্চয়তা নেই? তাই কারা মব করছে, কোথা থেকে তারা আসছে, কিভাবে তারা সংগঠিত হচ্ছে এবং কেন মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস পাচ্ছে- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এখন জরুরি।
একইভাবে খুন, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, যৌন সহিংসতাসহ নানা ধরনের বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কেন বাড়ছে, এর কারণ কি, কোথায় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কারা এসবের সুযোগ নিচ্ছে- এসবও গভীরভাবে তদন্ত হওয়া দরকার। শুধু অপরাধের পর গ্রেফতার, মামলা বা শাস্তির উদ্যোগ নিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, অপরাধের মূল কারণ এবং এর পেছনের শক্তিগুলোকেও চিহ্নিত করতে হবে। কারণ সরকার পরিবর্তন হবে, অন্য দল ক্ষমতায় আসবে, নতুন নেতৃত্ব আসবে, আবার বিদায় নেবে- এটাই রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের চাওয়া বেশি কিছু নয়। মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়, নিরাপদে চলতে চায়, সন্তানকে নিরাপদে স্কুলে পাঠাতে চায় এবং বিপদে পড়লে আইনের আশ্রয় নিতে চায়। কে সরকারে, কোন দল ক্ষমতায় আছে, কিংবা দেশ পরিচালনা করছে- এসব বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষ ভাবে না, সাধারণ মানুষের প্রশ্ন হলো, তারা নিরাপদে চলতে ফিরতে পারবে কি না।
আমিও একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এটাই চাই- শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও আইনের শাসনভিত্তিক বাংলাদেশ। তাই এখনই সময় রাষ্ট্র ও সমাজকে নিজেদের দিকে তাকানোর। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, সরকারদল ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইবে, বিরোধীদল ক্ষমতায় যেতে চাইবে- এটাই গণতন্ত্র। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারোর নেই। রাজনীতিতে প্রতিবাদ থাকবে, কিন্তু সহিংসতা নয়, বিচার দাবি থাকবে, কিন্তু মব সন্ত্রাস করে বিচার নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা বা বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ইতিহাসকে অস্বীকার করে কিংবা রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে কোনো সুস্থ ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব নয়।
সাধারণ মানুষ ক্ষমতার রাজনীতির জটিল হিসাব বোঝে না, তারা সহজে বোঝে জানমালের নিরাপত্তা। মানুষ বড় বড় বক্তৃতা নয়, শান্তি চায়, প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চায়। চেনা মুখগুলো যখন হঠাৎ অচেনা চরিত্রে নিজেদের প্রকাশ করে, তখন শুধু বিস্মিত হলেই হবে না- কেন এমন পরিবর্তন হলো, তার কারণও খুঁজতে হবে। কারণ সেই অচেনা মুখ ও অজানা চরিত্র যদি সমাজ এবং রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তাহলে এর দায় শুধু রাজনীতিবিদদের নয়, আমাদের সবার। রাষ্ট্র যদি মানুষের এ মৌলিক চাওয়া পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে রাষ্ট্র ও সরকারকে অবশ্যই এর জবাবদিহি করতে হয়। যা আমরা দেখতে পারছি- অতীত সরকারের জবাবদিহিতা চলমান।