পেশায় তিনি একজন সাধারণ বাবুর্চি। কিন্তু রান্নাঘরের চুলার আড়ালে আর পর্দার অন্তরালে গড়ে তুলেছিলেন অপরাধের এক অন্ধকার জগত। বাবুর্চির ছদ্মবেশে নিজ স্ত্রীকে ঘুটির মতো ব্যবহার করে এবং ডান্স ক্লাবের আড়ালে তরুণীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সন্ধান মিলেছে।
এই চক্রের মূলহোতা আব্দুর রব বাবুর্চি (যার বাড়ি নোয়াখালী জেলায়), অপরাধ জগতে যিনি 'রকি' নামে পরিচিত। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম নগরের স্টিলমিল বাজার এলাকার মকবুল সোসাইটিতে ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। চট্টগ্রামের নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে শুরু হওয়া তার এই অপরাধের জাল ছড়িয়ে পড়েছে নগরের বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও বাসাবাড়িতে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় বেরিয়ে এসেছে রকির অপরাধের নানা চাঞ্চল্যকর অধ্যায় এবং কীভাবে ‘ডান্স ক্লাব’ ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে তরুণীদের অনৈতিক বাণিজ্যে নামানো হতো, তার সচিত্র ও অডিও প্রমাণ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রকি একসময় চট্টগ্রাম নগরের নতুন ব্রিজ এলাকায় 'সাউন্ড বক্সের' একটি ছোট দোকান পরিচালনা করতেন। পাশাপাশি সুযোগ বুঝে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সোর্স (তথ্যদাতা) হিসেবেও কাজ শুরু করেন। মূলত পুলিশের সোর্স পরিচয়ের আড়ালকে কাজে লাগিয়েই তিনি নিজের অপরাধ কর্মকাণ্ডকে সুরক্ষা দিতে থাকেন।
পরবর্তীতে চট্টগ্রামের ‘নিত্য শিল্প গোষ্ঠী’ নামক একটি তথাকথিত সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হন রকি। সেখানেই পরিচয় হয় কথিত ‘ডান্স মাস্টার’ মুরাদের সাথে। এই মুরাদ বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরের হাসপাতাল গেট সংলগ্ন কাঁচা বাজার এলাকার কামারের দোকানের বিপরীতে বাস করেন। রকি ও মুরাদের এই মেলবন্ধনের পরই শুরু হয় তাদের যৌথ অনৈতিক বাণিজ্যের ভয়ংকর অধ্যায়।
অভিযোগ রয়েছে, ডান্স ক্লাবে আসা সহজ-সরল তরুণীদের টার্গেট করতেন মুরাদ। ডান্সের আড়ালে মেয়েদের নানা ফাঁদে ফেলে তাদের তুলে দেওয়া হতো রকির কাছে। এরপর রকি ও মুরাদ সিন্ডিকেট চট্টগ্রামের বিভিন্ন আবাসিক হোটেল কিংবা ভাড়া বাসায় এসব মেয়েদের পাঠাতো।
অনুসন্ধানী দলটির হাতে আসা অডিও কল রেকর্ড এবং এক্সক্লুসিভ ভিডিও ফুটেজে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, তানিয়া (ছদ্মনাম) নামের এক তরুণীকে পতেঙ্গার বহুল পরিচিত ‘সমুদ্র বিলাস’ নামক একটি আবাসিক হোটেলে পাঠানো হয়। হোটেলের ‘আনোয়ার’ নামের এক কর্মচারীর কাছে তানিয়াকে পৌঁছানোর চুক্তি চূড়ান্ত করেন রকি ও মুরাদ।
তথ্য যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা ওই হোটেলের কর্মচারী আনোয়ারের সাথে গ্রাহক ছদ্মবেশে যোগাযোগ করেন। ছদ্মবেশী টিমের সাথে কথোপকথনে আনোয়ার স্বীকার করেন যে, ৪ হাজার টাকার বিনিময়ে তানিয়া নামের ওই তরুণীর সাথে ২ ঘণ্টার জন্য চুক্তিবদ্ধ করা সম্ভব। এরপর সাংবাদিকদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে পুরো সিন্ডিকেটের মেকানিজমটি স্পষ্ট হয়।
সংবাদ টিমের ছদ্মবেশী অভিযানের একপর্যায়ে ভুক্তভোগী তানিয়ার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়। নিজের করুণ জীবনের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন তিনি। তানিয়া জানান:
"বাবুর্চি প্রকাশ রকি আমাকে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেয়, কিন্তু স্ত্রীর মর্যাদা বা অধিকার বলতে আমি কিছুই পাইনি। আমাকে দিয়ে জোরপূর্বক এই অনৈতিক ব্যবসা করানো হয়। শুধু আমি নই, রকির ঘরে 'তামান্না' (ছদ্মনাম) নামের আরেকটি মেয়েকে আটকে রাখা হয়েছে। ডান্স মাস্টার মুরাদের মাধ্যমে বিভিন্ন ডান্স ক্লাব থেকে মেয়ে এনে রকি নিজের ঘরে রাখে এবং বিভিন্ন জায়গায় পাঠায়। আমার জীবনটা আজ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।"
সাধারণ বাবুর্চির পোশাক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের আড়ালে গড়ে ওঠা এই চক্রের কারণে ধ্বংস হচ্ছে অসংখ্য তরুণীর জীবন। প্রশ্ন উঠেছে, পতেঙ্গার 'সমুদ্র বিলাস'-এর মতো আবাসিক হোটেলগুলোতে কীভাবে প্রকাশ্যে এমন অসামাজিক বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে? স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে দীর্ঘদিন এই রকি-মুরাদ সিন্ডিকেট সক্রিয় রইল, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
(রকি-মুরাদ সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামসহ বিস্তারিত তথ্য আগামী পর্বে প্রকাশ করা হবে)