রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোতে রাজউক ও সিটি কর্পোরেশনের নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে পুরান ঢাকার লালবাগ থানাধীন আজিমপুর, বটতলার ৩৮ নম্বর গলি এলাকা। এই এলাকার আবাসিক ভবনগুলোর বেশকিছু ভবন দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বাণিজ্যিক কার্যকলাপে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এলাকার ‘মঞ্জিল-ই-মোবারক’ নামক ভবনসহ বেশকিছু ভবনে বাণিজ্যিক অনুমোদন ছাড়াই “মায়ের আদর ছাত্রী নিবাস” নামে একটি মেস বা ছাত্রী হোস্টেলের ব্যবসা চালানো হচ্ছে। এই রমরমা ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছেন ভবনটির মালিক মো. মনিরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাইফুদ্দিন আহমেদ সফিক ও কুমকুম আহমেদ নামের এক দম্পতি। স্থানীয়দের অভিযোগ এবং অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে যে, এই দম্পতি সিন্ডিকেট শুধু এই একটি ভবনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ৩৮ নম্বর গলি এলাকার প্রায় ডজনখানেক আবাসিক ভবনের কোনো কোনো ভবনে ৫ থেকে ৮টি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সমজাতীয় বাণিজ্যিক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনা করে আসছে।
ছাত্রীনিবাসটি পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আইনি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং স্থানীয় প্রশাসনের কোনো প্রকার অনুমোদন বা বাণিজ্যিক লাইসেন্স ছাড়াই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এই ব্যবসা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা করায় বিভিন্ন বহুতল ভবনের এই ছাত্রী-নিবাসে অবস্থানরত ছাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
প্রশাসনের নজরদারি এড়াতে এবং গ্রাহক আকর্ষণের জন্য এই চক্রটি অত্যন্ত চতুরতার সাথে “অনলাইন ও অফলাইনে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে” তাদের এই অবৈধ কার্যক্রমের প্রসার ঘটিয়ে চলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে চটকদার বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি স্থায়ীভাবে অফলাইন লিফলেট ও পোস্টার ব্যবহার করে ছাত্রীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। ছোট একটি আবাসিক এলাকায় এতগুলো ভবনে এভাবে বাণিজ্যিক মেস পরিচালনার ফলে এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং বহিরাগতদের আনাগোনা বাড়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা ও অভিভাবকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে সূত্রে জানা যায়।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও সিটি কর্পোরেশনের বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী, আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্পূর্ণ বেআইনি। নগর উন্নয়ন আইন ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী, আবাসিক ভবনে অননুমোদিত বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য আর্থিক জরিমানা, সিলগালা বা উচ্ছেদ অভিযানের বিধান রয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনের আইন অনুযায়ী, অনুমতিবিহীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স বাতিলসহ তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ছাড়পত্র ছাড়া বহুতল ভবনে গণ-আবাসন বা হোস্টেল পরিচালনা করা অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
“মায়ের আদর ছাত্রী নিবাস” পরিচালনা পর্ষদ প্রধান কুমকুম আহমেদের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান যে, তাদের ট্রেড লাইসেন্স আছে, এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্রের কাজ চলমান রয়েছে। তবে তাঁর কথার সূত্র ধরে সিটি কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের ইস্যুকৃত ট্রেড লাইসেন্স তাদের নথিতে নেই।
প্রশাসনের সকল নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে একটি আবাসিক এলাকায় বৃহৎ পরিসরে মেস/মহিলা হোস্টেলের এই রমরমা ব্যবসা চলছে, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। জরুরি ভিত্তিতে রাজউক, সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে এই অনুমোদনহীন মেস ব্যবসা বন্ধ এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।