নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এ জন্য ব্যাংক খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করেছে। এর মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকার ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। নতুন নিলামের মাধ্যমে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হলে চলতি মাসে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
এর আগে চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে ৫৬ হাজার কোটি, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন পে স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। এ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ১৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী ১ নভেম্বর নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।
বাড়ছে সরকারি ঋণের সুদহার
সরকারের ঋণ গ্রহণের চাপ বাড়ায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। গত ৫ অক্টোবর ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২৬ অক্টোবর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে। দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ইল্ডও বেড়েছে।
অন্যদিকে, ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ গত আগস্ট শেষে ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। এত বিপুল তারল্য থাকা সত্ত্বেও সরকারি ঋণের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্থ সংগ্রহ করতে না পারায় সরকারের ব্যাংকঋণের প্রয়োজন বাড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারের অর্থায়নের চাহিদা পূরণ করছে। চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার সুকুক ছাড়ার লক্ষ্যও রয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বাড়লে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে।
রাজস্ব ঘাটতিতে বাড়ছে ব্যাংকঋণের চাপ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল রেকর্ড ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
এদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। প্রত্যাশার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারের নিয়মিত ব্যয় মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশন বাবদ চলতি অর্থবছরের বাজেটে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় আরও প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। এতে আগামী দিনে সরকারের অর্থায়নের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।