যৌতুকের দাবিতে ২০০৫ সালে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল কিশোরী সামিনাকে। দীর্ঘ ১৩ বছর বিচার শেষে ২০১৮ সালে তাঁর স্বামীসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯। তবে রায়ের আট বছর পরও কার্যকর হয়নি সেই দণ্ড। এখনও উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে মামলাটি।
সামিনার মা নাজমা বেগমের মতো অসংখ্য ভুক্তভোগী পরিবার বছরের পর বছর ধরে চূড়ান্ত বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এত দিনেও ফাঁসি হইল না।’ অভিযোগ করেন, আসামিপক্ষের স্বজনদের হুমকি ও নির্যাতনের মুখেও পড়তে হচ্ছে তাঁকে।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২৭৩ জন বন্দী বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। সব ধরনের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীর সংখ্যা ২ হাজার ৭০৭ জন। অথচ দেশের কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দীর সংখ্যা অনেক বেশি।
আইন অনুযায়ী, বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলেই তা কার্যকর হয় না। উচ্চ আদালতের অনুমোদন, ডেথ রেফারেন্স, জেল আপিল, নিয়মিত আপিল ও অন্যান্য আবেদন নিষ্পত্তির পরই কার্যকর হতে পারে চূড়ান্ত রায়। এ প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর সময় লেগে যায়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি বিভাগের পরিচালক দীপ্তি সিকদার বলেন, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারকে আসামিপক্ষের হুমকি ও চাপের মধ্যেও জীবনযাপন করতে হয়।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে বিচারিক আদালতের রায় হওয়ায় ডেথ রেফারেন্সের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে বিচারিক আদালতের দ্রুত রায়ের পরও উচ্চ আদালতে শুনানি ও নিষ্পত্তি বিলম্বিত হলে চূড়ান্ত বিচার পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলোর ডেথ রেফারেন্স ও আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে প্রধান বিচারপতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
এদিকে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের কারাগারে রাখা প্রশাসনিকভাবেও চ্যালেঞ্জের বিষয়। বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হলে কারাগারের ওপর চাপও কমবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত বিচার শুধু রায় দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আপিল ও ডেথ রেফারেন্সসহ পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করাই প্রকৃত ন্যায়বিচার নিশ্চিতের অন্যতম শর্ত।