আব্দুল কাইয়ুম আরজু, পটুয়াখালী প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ কেবল একটি শিল্প নয়, বরং এটি উপকূলীয় মানুষের জীবনধারা ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল থেকে ১১ মে পর্যন্ত মৎস্য আহরণে ৫৮ দিনের যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, এর মূল লক্ষ্য হলো সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মাছের প্রজনন ও উৎপাদন নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান বছরের বাস্তবতা বলছে, সরকার আরোপিত এই উদ্যোগটি আজ প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার অভাব এবং অব্যবস্থাপনার গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে।
পরিবেশগত বিপর্যয় ও জীববৈচিত্র্যের ঝুঁকি এখন দৃশ্যমান। বিজ্ঞানসম্মতভাবে মাছের প্রজননকাল হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন যখন অবাধে মাছ শিকার চলে, তখন কেবল পরিণত মাছ নয়, বরং রেণু ও জাটকাও ধ্বংস হয়ে যায়। এর ফলে সাগরের বাস্তুসংস্থান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অপরদিকে দীর্ঘমেয়াদে সাগরের মৎস্য ভাণ্ডার নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা পটুয়াখালীর উপকূলীয় জনপদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ সংকেত। পরিবেশের এই ভারসাম্যহীনতা কেবল মাছের ওপর নয়, বরং গোটা উপকূলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সরকারি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে। মৎস্য বিভাগ, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড এবং নৌবাহিনীর মতো সংস্থাগুলোর উপস্থিতি সত্ত্বেও রামনাবাদ ও আন্ধারমানিক মোহনায় জেলেদের অবাধ চলাচল এবং স্থানীয় আড়তগুলোতে রীতিমতো মাছ আহরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহন এখন প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু চক্রের যোগসাজশে আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে জেলেরা নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করছেন না। ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে ট্রলার প্রতি ‘নিরাপদ মাছ শিকারের’ যে অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে, তা যদি সত্য হয়, তবে এটি কেবল অনিয়ম নয়, এটি দেশের সম্পদের সাথে এক ধরণের রাষ্ট্রদ্রোহিতা। যখন রক্ষক নিজেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন আইনের শাসন মুখ থুবড়ে পড়ে। এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমনে যে ক্ষোভ, তা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এই ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন সৎ এবং দরিদ্র জেলেরা। সরকারি আইন মেনে যারা বাড়িতে বসে থেকেছেন, তারা একদিকে যেমন খেয়ে না খেয়ে দিন কাটিয়েছেন, অন্যদিকে তাদের আয়ের পথ বন্ধ থাকায় তারা আজ ঋণের দায়ে জর্জরিত। কর্মহীন থাকা ৫৮টি দিন জেলেদের সংকট আসলেই অমানবিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু সরকারের নির্ধারিত ভিজিএফ এর খাদ্য সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে জানান জেলেরা। তবে নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন জেলেদের শুধু খাদ্য সহায়তা নয়, নগদ অর্থ সহায়তার দাবি তাদের। অপরদিকে জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা বন্টনের জন্য প্রকৃত জেলেদের নিবন্ধনের আওতায় আনার দাবি জানান ভুক্তভোগীরা।
তবে সেসকল জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকার করেছেন, তারা সাময়িকভাবে লাভবান হলেও, দীর্ঘমেয়াদে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার যে আশঙ্কা রয়েছে তাতে পুরো মৎস্য শিল্পের অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের ঝুঁকি বাড়ছে।
কুয়াকাটার মৎস্য ব্যবসায়ী রাকিব জোমাদ্দার বলেন, বড় আকারের ইলিশসহ পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়লে কয়েক মাসে জেলেদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। তবে মাছের পরিমাণ কম হলে আবারও আর্থিক সংকটে পড়তে হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জেলে ও অন্যান্য ব্যবসায়ীরা।
জেলা মৎস্য বিভাগ অনুযায়ী, পটুয়াখালীর ৭৫ হাজার নিবন্ধিত জেলেসহ লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকা এই মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। জেলার কলাপাড়া, রাঙ্গাবালী এবং মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরে এই পেশার মানুষের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, এই নিষেধাজ্ঞার সুফল হিসেবে মাছের উৎপাদন বাড়ার কথা। কিন্তু আইন প্রয়োগে যদি ছিদ্র থেকে যায়, তবে সেই উৎপাদন কতটা বাড়বে, তা অনিশ্চিত। নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে সরকারি সহায়তা হিসেবে ভিজিএফের চাল বিতরণ করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নিষেধাজ্ঞার সুফল হিসেবে এবার সাগরে মাছের উৎপাদন বাড়বে এবং জেলেরা ভালো আয় করতে পারবেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।