সতীদাহের করুণ স্মৃতি বহন করছে কিশোরগঞ্জের জ্ঞানদা সুন্দরীর মঠ

Date: 2026-06-14
news-banner

মোঃ মাইন উদ্দিন :

বাংলার ইতিহাসে সতীদাহপ্রথা এক অন্ধকার ও বেদনাবিধুর অধ্যায়। নারীকে স্বামীর মৃত্যুর পর একই চিতায় আত্মাহুতি দিতে বাধ্য করার এই নির্মম সামাজিক রীতি আজ ইতিহাসের পাতায় স্থান পেলেও এর নীরব সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কিছু স্মৃতিচিহ্ন। তেমনই একটি নিদর্শন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার গুজাদিয়া ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে অবস্থিত জ্ঞানদা সুন্দরীর সতীদাহ মঠ।

নরসুন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা জরাজীর্ণ এই মঠ শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি উনিশ শতকের সমাজব্যবস্থা, নারীর অসহায়ত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধের জন্য পরিচালিত সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল।

কিশোরগঞ্জের ইতিহাস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাংলা ১২৩৪ সনের ২৬ বৈশাখ গুজাদিয়ার একটি প্রভাবশালী জমিদার পরিবারের বিশ্বস্ত কর্মচারীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী জ্ঞানদা সুন্দরী দেবী স্বামীর চিতায় সহমৃতা হন। ঘটনাটি এমন এক সময়ে সংঘটিত হয়েছিল, যখন সমগ্র ভারতবর্ষে সতীদাহপ্রথা বন্ধে আন্দোলন তুঙ্গে। মানবতাবাদী চিন্তাবিদ ও সমাজ সংস্কারকদের নেতৃত্বে এ প্রথা বিলোপের দাবিতে জোরালো জনমত গড়ে উঠছিল এবং ব্রিটিশ সরকারও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছিল।

জ্ঞানদা সুন্দরীর মৃত্যুর পর বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন প্রশাসনের কাছে অভিযোগ ওঠে যে, তাঁকে স্বেচ্ছায় নয়, বরং বলপূর্বক সহমরণে বাধ্য করা হয়েছিল। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছিল। মামলায় অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তিনি নিজের ইচ্ছাতেই চিতায় আরোহণ করেছিলেন। তবে মামলার বিচার চলাকালে সরকারপক্ষ গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন তোলে- যদি তিনি স্বেচ্ছায় সহমৃতা হয়ে থাকেন, তবে চিতা প্রজ্বলনের আগেই কেন চারপাশে খুঁটি পুঁতে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল?
এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে ব্যর্থ হয় অভিযুক্ত পক্ষ। মামলার রায়ে জ্ঞানদা সুন্দরীর বড় ছেলে গয়ারাম চক্রবর্তীকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি তৎকালীন পূর্ববঙ্গে সতীদাহসংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য বিচারিক ঘটনাগুলোর অন্যতম।

পরবর্তীতে গয়ারাম চক্রবর্তী তাঁর মায়ের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ঘটনাস্থলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন, যা আজ ‘জ্ঞানদা সুন্দরীর সহমরণ মঠ’ নামে পরিচিত। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মঠ এখন সময়ের ভারে ন্যুব্জ। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, স্থাপনাটি একদিকে হেলে পড়েছে এবং দ্রুত সংরক্ষণ উদ্যোগ না নেওয়া হলে যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে।

মঠটির পাশেই রয়েছে জ্ঞানদা সুন্দরীর বসতভিটা। একসময় মানুষের পদচারণায় মুখর এই বাড়িটি আজ পরিত্যক্ত ও নিস্তব্ধ। চারপাশের পরিবেশ যেন অতীতের এক করুণ কাহিনি নীরবে স্মরণ করিয়ে দেয়। 

শুধু জ্ঞানদা সুন্দরী মঠ নয়, কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় এখনো সতীদাহপ্রথার স্মৃতিবাহী নানা স্থান ও লোককথার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এর মধ্যে তাড়াইল উপজেলায় রয়েছে ‘সতীরগাঁও’, বাজিতপুরের ‘সতীর খাল’ ও ‘সতীর ভিটা’ এবং করিমগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি এলাকার নরসুন্দা তীরবর্তী ঘোড়াঘাটও ইতিহাসের সেই অধ্যায়ের স্মারক হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও কুলিয়ারচর উপজেলার ছয়সূতী, আগরপুর ও সালুয়া এলাকায় রয়েছে নানা স্মৃতি বহনকারী মঠ।

১৮২৯ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে সতীদাহপ্রথা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু নিষিদ্ধ হওয়ার বহু বছর পরও এই প্রথার স্মৃতি ছড়িয়ে রয়েছে বাংলার নানা জনপদে। জ্ঞানদা সুন্দরীর মঠ সেই ইতিহাসেরই এক নীরব সাক্ষী। যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় নারীর অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সংস্কারের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের কথা।

আজ প্রয়োজন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ। কারণ এগুলো শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, বরং আমাদের সামাজিক ইতিহাস, সংস্কার আন্দোলন এবং মানবতার জয়গানের মূল্যবান দলিল।

Leave Your Comments