পোশাক পাল্টেছে পুলিশের, বদলায়নি চরিত্র—সিদ্ধিরগঞ্জে গ্যারেজে অভিযান ঘিরে গুরুতর অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ: 

সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পুলিশের আচরণ ও কার্যক্রমে পরিবর্তন আসবে—এমন প্রত্যাশা ছিল সাধারণ মানুষের। তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পশ্চিমপাড়া কান্দাপাড়া এলাকার কয়েকজন ভুক্তভোগী। একটি গ্যারেজে গভীর রাতে পুলিশের অভিযানকে কেন্দ্র করে ব্যাটারি, নগদ টাকা ও অটোরিকশার চার্জ বাবদ অর্থ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে গ্যারেজের নৈশপ্রহরী ও ম্যানেজারকে আটক করে মারধর, ভয়ভীতি দেখিয়ে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় এবং ডাকাতি মামলায় চালান দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তাদের স্বজনরা।

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৭ জুলাই ২০২৬ রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার মিজমিজি পশ্চিমপাড়া কান্দাপাড়া এলাকার শাকিল নামের এক ব্যক্তির গ্যারেজে একদল পুলিশ অভিযান চালায়। পুলিশের পক্ষ থেকে সেখানে ডাকাতির ব্যাটারি রয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে গ্যারেজে অভিযান চালানো হয় বলে দাবি স্থানীয়দের।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ওই সময় গ্যারেজে চার্জে থাকা অটোরিকশা ও ইজিবাইক থেকে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের দাবি, প্রায় ১২০টি ব্যাটারির, যার আনুমানিক মূল্য ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। এছাড়া সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা তথ্য অনুযায়ী গ্যারেজে থাকা প্রায় ২৫ হাজার টাকা নগদ অর্থ এবং অটোরিকশার চার্জ বাবদ আরও কিছু অর্থ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

পরিবারের অভিযোগ, অভিযানের সময় গ্যারেজের নৈশপ্রহরী ও ম্যানেজারকে ‘ওসি সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে হবে’ বলে সঙ্গে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে মিথ্যা জবানবন্দি নেওয়া হয় বলে দাবি স্বজনদের। এরপর তাদের ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলেও অভিযোগ পরিবারের।

ভুক্তভোগীদের স্বজনদের আরও অভিযোগ, আটকের পর তাদের রিমান্ডে নেওয়ার ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে মোট ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে আরও টাকা দাবি করা হচ্ছে এবং টাকা না দিলে ১০ থেকে ১৫টি মামলা দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগও করেছেন তারা।
ঘটনার সময় আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে এসে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন বলে স্থানীয়দের দাবি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যরা নিজেদের নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানার পুলিশ হিসেবে পরিচয় দেন। অভিযানে এসআই ইয়াসিন আরাফাত ও এএসআই শাহিনসহ আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের এক সদস্য বলেন, ‘আমরা অসহায়। আমাদের চোখের সামনে আমার বাবাকে মারধর করা হয়েছে। তিনি নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আমরা বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছি। কিন্তু এরপরও বিভিন্ন সময় ফোন করে আরও টাকা চাওয়া হচ্ছে এবং মামলা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’
পরিবারটির দাবি, তারা কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন। তাদের অভিযোগ, নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে ডাকাতির মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের ঘটনা তদন্ত করা প্রয়োজন।

এদিকে, পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও পুলিশের অভিযানের প্রকৃত কারণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে তা পুলিশের ভাবমূর্তির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী এ ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তাদের প্রশ্ন—পুলিশের পোশাক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের আচরণে পরিবর্তন কবে আসবে? আর মানুষ কবে পুলিশের হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ থেকে প্রকৃত অর্থে মুক্তি পাবে?

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।