প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
সময়: ১১:২৫ পিএম
কুলিয়ারচরের ঘটনা: সালিশে নয়, বিচার হোক নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনী প্রক্রিয়ায়
মোঃ মাইন উদ্দিন :
কুলিয়ারচরে ১১ বছর বয়সী এক মেয়ে শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ এবং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কথিত সালিশে ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের অভিযোগ- দুটি বিষয়ই গভীর উদ্বেগের। এটি শুধু একটি মামলার ঘটনা নয় এর মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজে বিচারব্যবস্থা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আইনের শাসন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে।
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, অভিযোগ আর প্রমাণিত অপরাধ এক নয়। শিশুটির ওপর যৌন সহিংসতার অভিযোগের সত্যতা তদন্ত, ডাক্তারী পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য আইনসম্মত প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার আদালতের। সুতরাং কোনো পক্ষকে আগেভাগে অপরাধী সাব্যস্ত করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি অভিযোগকে স্থানীয় প্রভাব-প্রতিপত্তির মাধ্যমে চাপা দেওয়ার চেষ্টাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি হলো কথিত সালিশ। যদি সত্যিই এমন কোনো সালিশ বসে থাকে এবং সেখানে অর্থের বিনিময়ে একটি শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ মীমাংসার চেষ্টা করা হয়ে থাকে, তবে সেটি নিছক সামাজিক ভুল নয়, এটি আইনের শাসনের প্রতি গুরুতর অবজ্ঞার প্রশ্ন তুলবে।
শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ কোনো পারিবারিক বিরোধ নয় যে, স্থানীয়ভাবে বসে অর্থের অঙ্ক নির্ধারণ করে তা নিষ্পত্তি করা যাবে। একটি শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে কোনো টাকার অঙ্কে মাপা যায় না, বরং এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়াই হবে একমাত্র পথ।
এখানে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। কথিত সালিশে কারা উপস্থিত ছিলেন? ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের ভিত্তি কী ছিল? অর্থ দেওয়ার বা নেওয়ার কোনো প্রমাণ আছে কি? সালিশে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন কি না? যদি থেকে থাকেন, তাঁদের ভূমিকা কি ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
কারণ, কোনো অপরাধের অভিযোগকে সামাজিকভাবে মীমাংসার নামে চাপা দেওয়ার সংস্কৃতি শুধু একটি মামলাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, এটি সমাজে ভুল বার্তাও দেয়। এতে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হতে পারে এবং ভবিষ্যতে অন্যরাও আইনগত প্রতিকার চাইতে ভয় পেতে পারে।
আরও যুক্ত হয়েছে ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারকে হুমকির অভিযোগ। অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি আরও গুরুতর। কোনো মামলা বা তদন্তে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভয়ভীতি বা চাপ প্রয়োগের সুযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই তদন্তের পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবার ও প্রয়োজনীয় সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।
অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। তিনি যে দলেরই নেতা বা কর্মী হন না কেন, সেটি তদন্তের মানদণ্ড বদলে দিতে পারে না। রাজনৈতিক পরিচয় যেমন কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না, তেমনি কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগকে প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা উচিত নয়। সত্য উদঘাটনের একমাত্র পথ হলো নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়সংগত বিচার।
কুলিয়ারচর থানায় মামলা হয়েছে, তদন্ত ও গ্রেফতার কার্যক্রমের কথাও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তদন্ত যেন কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা স্থানীয় প্রভাবের কাছে নতিস্বীকার না করে। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই, প্রয়োজনীয় ডাক্তারী পরীক্ষা ও আইনসম্মত আলামত সংগ্রহ, সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং কথিত সালিশের বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি।
তবে এই ঘটনার বিচার করতে গিয়ে আবেগ নয়, প্রয়োজন আইনের প্রতি আস্থা। একই সঙ্গে প্রয়োজন শিশুটির প্রতি সংবেদনশীলতা এবং তার গোপনীয়তা রক্ষা। কোনোভাবেই এমন কোনো তথ্য বা ছবি প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুটির পরিচয় প্রকাশ করে কিংবা ভবিষ্যতে তার জন্য সামাজিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
আমরা এমন সমাজ চাই না, যেখানে একটি শিশুর সম্ভাব্য নির্যাতনের মূল্য নির্ধারণ হয় টাকার অঙ্কে। আবার এমন সমাজও চাই না, যেখানে অভিযোগ উঠলেই বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করে দেওয়া হয়। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, ভুক্তভোগী সুরক্ষা পাবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিও ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার অধিকার রাখবেন।
কুলিয়ারচরের ঘটনাটি তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে- আমরা কি সালিশের নামে অভিযোগ চাপা দেওয়ার সংস্কৃতি চাই, নাকি আইনের শাসনের সমাজ চাই?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু পুলিশ, প্রশাসন বা আদালতের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। সমাজের জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষ- সবার দায়িত্ব হলো স্পষ্ট করে বলা: শিশুর মর্যাদার কোনো দাম নেই, আর অপরাধেরও কোনো সালিশি মূল্য নির্ধারণ হতে পারে না।
আইন তার নিজস্ব গতিতে চলুক। সত্য উদঘাটিত হোক। অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীর পরিচয় বা প্রভাব নয়, অপরাধই বিবেচ্য হোক। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিও ন্যায়বিচার পান- এটাই একটি সভ্য ও আইনের শাসনভিত্তিক সমাজের প্রত্যাশা।