জনআকাঙ্ক্ষার কাঠগড়ায় সরকার: ছয় মাসে প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতা ও জবাবদিহির সংকট

এস আই খান:

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ভর করে জনগণের প্রতি সরকারের জবাবদিহি, কার্যকর সংসদ, দক্ষ প্রশাসন এবং দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ওপর। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর অনেক মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান কেন এত বড়?

সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং উন্নয়নের নানা পরিকল্পনার কথা বলেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। চাল, ডাল, তেলসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও তার ইতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষ এখনো প্রত্যাশিতভাবে অনুভব করতে পারেনি। ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তা সুরক্ষায় সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।

প্রশাসনিক সেবার ক্ষেত্রেও মানুষের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। অনেক নাগরিকের অভিজ্ঞতা হলো, সরকারি দপ্তরে এখনো দীর্ঘসূত্রতা, জটিলতা এবং সেবাপ্রাপ্তিতে নানা ধরনের ভোগান্তি রয়েছে। কোথাও কোথাও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও সামনে আসে। এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হতে পারে।

জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব শুধু নীতিনির্ধারণ নয়, জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং তাদের সমস্যার সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব বেড়েছে। মাঠপর্যায়ে জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

জাতীয় সংসদ গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র। সেখানে সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া উচিত। কিন্তু সংসদের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে যে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের অনেক বিষয় আরও বিস্তৃতভাবে আলোচিত হওয়া প্রয়োজন। সংসদে প্রাণবন্ত বিতর্ক এবং কার্যকর কমিটি ব্যবস্থা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

একইভাবে বিরোধী দলের ভূমিকাও গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। জনগণের সমস্যা তুলে ধরা, সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করা এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাব করা একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের প্রধান কাজ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক তৎপরতা ও জনসম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দলের উপস্থিতি সরকারকেও আরও জবাবদিহিমূলক হতে উৎসাহিত করে।

আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতেই জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। এসব খাতে নীতির ধারাবাহিকতা, সেবার মান এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। জনগণ উন্নয়নের ঘোষণা নয়, তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা। বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ, প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং সরকারি সেবাকে আরও সহজ ও নাগরিকবান্ধব করে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে সংসদকে আরও কার্যকর করা এবং ভিন্নমতকে গণতান্ত্রিকভাবে মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোকেও কেবল সংবাদ সম্মেলন বা বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে জনগণের বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে মাঠপর্যায়ে আরও সক্রিয় হতে হবে। দায়িত্বশীল, শান্তিপূর্ণ এবং গঠনমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে।

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; বিরোধী দল, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু নেতৃত্বের প্রধান দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়। তাই জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক হতে হবে।

ছয় মাস একটি সরকারের সামগ্রিক সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণের জন্য দীর্ঘ সময় নয়। তবে এটি দিকনির্দেশনা বোঝার জন্য যথেষ্ট। জনগণ এখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়। সেই বাস্তবতা নিশ্চিত করতে হলে আত্মসমালোচনা, জবাবদিহি এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতা নয়, জনগণের আস্থা।