প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬
সময়: ০৭:৩৯ পিএম
ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা নয়- নিজে নতুন ইতিহাস সৃষ্টির চেষ্টা করুন
মোঃ মাইন উদ্দিন :
ইতিহাস এমন এক অমোঘ সত্য, যার বিচরণ মানুষের মস্তিষ্ক ও চেতনার গভীরে। সময়ের প্রবাহে অনেক কিছু বদলে যেতে পারে, স্মৃতির ওপর ধুলোর আস্তরণ পড়তে পারে, কিন্তু কোনো জাতির সামষ্টিক ইতিহাসকে ইচ্ছেমতো মুছে ফেলা যায় না। ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায়, তার ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক করা যায়, এমনকি নিজেদের স্বার্থে তার ভিন্ন পাঠ দাঁড় করানোর চেষ্টাও করা যায়, কিন্তু সত্যকে চিরদিনের জন্য মিথ্যায় পরিণত করা যায় না।
ইতিহাস স্বীকার বা অস্বীকার করার প্রবণতা নতুন নয়। ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে কেউ কোনো ঘটনারক সত্যতা মানতে চাইতে পারেন, আবার কেউ তা অস্বীকারও করতে পারেন। সেটি অনেকাংশেই ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়। কিন্তু যখন কেউ জেনেশুনে সত্য ইতিহাসকে আড়াল করার চেষ্টা করেন, অসত্যকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান কিংবা পরিকল্পিতভাবে একটি মিথ্যা ন্যারেটিভ তৈরি করতে চান, তখন বিষয়টি আর ব্যক্তিগত মতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা হয়ে ওঠে জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, ইতিহাসের জায়গা দখল করতে কখনো কখনো প্রচারণা, আবেগ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্যকে হাতিয়ার করা হয়। কিছু মানুষ হয়তো সাময়িকভাবে সেই প্রচারণায় প্রভাবিত হতে পারেন। কেউ কেউ আবার ব্যক্তিগত স্বার্থে এমন প্রচেষ্টাকে উৎসাহও দিতে পারেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিচারক হলো সময়।
তাই প্রশ্ন হলো, সত্য ইতিহাসকে মুছে ফেলার এত চেষ্টা কেন? বরং যে ব্যক্তি ইতিহাসে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চান, তাঁর উচিত নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করার মতো কাজ করা। মানুষের কল্যাণে কিছু করা, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, মানুষের অধিকার ও মর্যাদার জন্য দাঁড়ানো কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কোনো ভালো দৃষ্টান্ত রেখে যাওয়া। আর এসবের মধ্য দিয়েই তো একজন মানুষ নিজের ইতিহাস রচনা করতে পারেন।
কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, অতীতের সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে দেওয়াও এক ধরনের ইতিহাস তৈরি করা। সাময়িকভাবে হয়তো এমন প্রচেষ্টা কিছু মানুষের প্রশংসা কুড়াতে পারে। আপনাকে কেউ মেধাবী বলতেও পারেন, বলতে পারে-আপনি সত্যকে মিথ্যা বানানোর সুন্দর কৌশল জানেন। কিন্তু প্রশংসার সেই বৃত্ত চিরস্থায়ী নয়। মানুষের স্মৃতি ও বিবেকের কাছে সত্যের নিজস্ব শক্তি রয়েছে।
ইতিহাস নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। ভিন্ন ব্যাখ্যাও থাকতে পারে। কিন্তু মতভেদ আর মিথ্যাচার এক জিনিস নয়। ইতিহাসের সঙ্গে বিতর্ক করা যায় যুক্তি দিয়ে, প্রশ্ন তোলা যায় তথ্য দিয়ে, নতুন ব্যাখ্যা দেওয়া যায় গবেষণার মাধ্যমে। কিন্তু সত্যকে বারবার মিথ্যা বানানোর চেষ্টা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
আমাদের মনে রাখা দরকার- একটি প্রজন্ম হয়তো বিভ্রান্ত হতে পারে, কিন্তু সময়ের দীর্ঘ পরীক্ষায় সত্যের সামনে মিথ্যার স্থায়িত্ব খুবই সীমিত। আজ যে অপপ্রচারকে শক্তিশালী মনে হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই হয়তো মানুষের কাছে হাস্যকর হয়ে উঠবে। আর যারা সত্যকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছেন, ইতিহাসের পাতায় তাঁদের ভূমিকা নিয়েও একদিন নির্মোহ মূল্যায়ন হবে।
সুতরাং আসুন, ইতিহাসকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার না করে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই। অতীতকে মুছে ফেলার চেষ্টা না করে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করি। অন্যের সত্যকে অস্বীকার করে নিজেকে বড় করার চেষ্টা না করে এমন কিছু করি, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কাজকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করে।
কারণ সত্যকে ঢেকে রাখা যায়, কিন্তু চিরদিনের জন্য চাপা দেওয়া যায় না। ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করা যায়, কিন্তু ইতিহাসের চূড়ান্ত রায়কে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। শেষ পর্যন্ত সময়ই বলে দেয়- কে সত্যের পক্ষে ছিল, আর কে সত্যকে আড়াল করে নিজের জন্য একটি মিথ্যা গল্প নির্মাণ করতে চেয়েছিল।
তাই ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা নয়- নিজের কর্ম দিয়েই নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করুন। মনে রাখবেন, মিথ্যা বয়ান নিয়ে জাতির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বড় কঠিন।