“মঞ্জিল-ই-মোবারক” আজিমপুরের মঙ্গলময় আবাস এখন আতঙ্কের প্রতীক
নিজস্ব প্রতিনিধি:
বাড়িটির
নাম “মঞ্জিল-ই-মোবারক”। এটি একটি আরবি-ফার্সি শব্দগুচ্ছ। যার অর্থ হলো
“সৌভাগ্যমন্ডিত প্রাসাদ” বা মঙ্গলময় আবাস”। ১৯৭৭ সালে রাজউকের (তদানীন্তন ডিআইটি)
অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী যখন এই তিনতলা আবাসিক ভবনের প্রথম তলার নির্মাণ কাজ সম্পন্ন
হয়, তখন বাড়ির মালিক মরহুম গোলাম মোস্তফা এর নামকরণ করেন “মঞ্জিল-ই-মোবারক”। তিনি
বিশ্বাস করতেন, ভবিষ্যতে যারা এই বাড়িতে বসবাস করবেন, তাঁরা যেন সৌভাগ্যের অধিকারী
হন এবং তাঁদের জীবন মঙ্গলময় ও নিরাপদ থাকে। সম্ভবত এই শুভকামনা হৃদয়ে ধারণ করেই
তিনি তাঁর প্রিয় আবাসের নাম রেখেছিলেন “মঞ্জিল-ই-মোবারক”। কিন্তু এই “মঞ্জিল-ই-মোবারক”
বা মঙ্গলময় আবাসে বসবাসকারীদের জীবন এখন আর নিরাপদ নয়; এলাকাবাসীর কাছেও এটি এখন
এক আতঙ্কের নাম।
রাজধানীর
লালবাগ থানাধীন আজিমপুরের বটতলা এলাকার ৩৮ নং গলিতে অবস্থিত মরহুম গোলাম মোস্তফার “মঞ্জিল-ই-মোবারক”
নামের পুরোনো তিনতলা ভবনটিতে বসবাসকারীদের জীবন আজ চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। তাঁর রেখে
যাওয়া এই পুরোনো কাঠামোটির ওপর এক ভাড়াটিয়া দম্পতি সাইফুদ্দিন আহমেদ সফিক ও কুমকুম
আহমেদ কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে চতুর্থ তলা নির্মাণ কাজ শুরু করায় পুরো
ভবনটির স্থায়িত্ব এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এ বিষয়ে বার্তা বিচিত্রা
পত্রিকায় ইতোমধ্যে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়; রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ
(রাজউক) ঘটনাস্থল আকস্মিক পরিদর্শন করে এবং বাস্তবতার নিরিখে রাজউক কর্মকর্তা
তাৎক্ষণিকভাবে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা প্রদান করেন। পরবর্তীতে এই
নির্মাণকাজের কোনো বৈধতা দেখাতে না পারায়, তাদের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ জারি করা
হয়েছে বলে রাজউক সূত্রে জানা যায়।
কিন্তু
রাজউকের এই স্পষ্ট নির্দেশনা ও ঝুঁকির বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ তোয়াক্কা না করে
অভিযুক্ত ভাড়াটিয়া দম্পতি অবৈধ নির্মাণকাজ অব্যাহত রেখেছেন। তিন কাঠা জায়গার ওপর
নির্মিত, পুরোনো কাঠামোর এই সাধারণ ১০ ইঞ্চি ‘লোড বেয়ারিং’ (Load-bearing) দেয়ালের
তিনতলা ভবনটির ওপর ইতোমধ্যে চতুর্থ তলার ইটের গাঁথুনি শেষ করা হয়েছে। এমনকি বাঁশ ও
কাঠের শাটারিং (Shuttering) সম্পন্ন করে ছাদের রড বাঁধার (Rod binding) কাজও
চুড়ান্ত করে ফেলেছেন তারা। স্থানীয়দের দাবি, নতুন করে যুক্ত হওয়া এই
নির্মাণসামগ্রীর মোট ওজন প্রায় ১০০ মেট্রিক টনের কাছাকাছি হতে পারে, যা যেকোনো সময়
বড় ধরণের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য জানার চেষ্টা
করা হলেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়
সূত্রে জানা যায়, আজিমপুর বটতলা এলাকার এই পুরোনো ভবনটির মূল কাঠামোটি প্রায় ৫০
বছরের প্রাচীন। প্রকৌশলগত নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো পুরোনো ভবনের ভিত্তি বা
ফাউন্ডেশনের একটি নির্দিষ্ট ভারবহন ক্ষমতা (Load-bearing capacity) থাকে। কিন্তু
ভবনটির বর্তমান মালিক, মরহুম গোলাম মোস্তফার ছেলে মো. মনিরের সরলতার সুযোগ নিয়ে
এবং ভাড়াটিয়া চুক্তির অপব্যবহার করে অবৈধ এই নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। এলাকাবাসীর
বারবার দেওয়া সাবধানবাণীতে কর্ণপাত না করে এবং কোনো প্রকার কাঠামোগত নকশা
(Structural design) যাচাই বা রাজউক অনুমোদন ছাড়াই ভবনটির ওপর অতিরিক্ত এই তলাটি
নির্মাণ করছেন অভিযুক্ত সাইফুদ্দিন আহমেদ সফিক ও কুমকুম আহমেদ দম্পতি।
প্রকৌশল
বিশেষজ্ঞদের মতে, বুনিয়াদি শক্তি (Foundation capacity) পরীক্ষা না করে এমন পুরোনো
ও জরাজীর্ণ কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত তলার লোড চাপানোর ফলে ভবনটির মূল ভিত্তি অত্যন্ত
দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে যেকোনো সময় সামান্য ভূমিকম্প, অতিবৃষ্টি বা কাঠামোগত
ক্লান্তি (Structural fatigue) এর কারণে বড় ধরণের ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। ভবনটিতে
বর্তমানে যারা বসবাস করছেন, তারা প্রতিনিয়ত এক চরম আতঙ্ক ও প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দিন
কাটাচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য কিছু আর্থিক মুনাফার লোভে এভাবে মানুষের
জীবনকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
এলাকাবাসী
ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, কোনো বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটার আগেই রাজধানী উন্নয়ন
কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ
নেওয়া। আইন অমান্যকারী ঐ দম্পতির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, ভবনটির
অননুমোদিত অংশ উচ্ছেদসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সেখানে বসবাসরত মানুষের
জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
উল্লেখ্য,
সাইফুদ্দিন আহমেদ সফিক ও কুমকুম আহমেদ দম্পতির এই ভবনে পাঁচটি ফ্ল্যাটসহ এলাকার
আরও বেশ কিছু আবাসিক ভবনে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে, “মায়ের আদর ছাত্রী নিবাস” নামক
বানিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি বার্তা বিচিত্রার গত সংখ্যার প্রতিবেদনে উঠে
এসেছিল। ওই সময় এ বিষয়ে জানতে চাইলে, কুমকুম আহমেদ বার্তা বিচিত্রাকে জানিয়েছিলেন,
তাঁদের এই ব্যবসার বৈধতা রয়েছে এবং এর অনুকূলে ব্যবসায়িক ট্রেড লাইসেন্সও আছে। এদিকে,
বর্তমান প্রতিবেদনটি তৈরির আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স শাখায়
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, “মায়ের আদর ছাত্রী নিবাস” নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের তথ্য তাঁদের
নথিতে পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বার্তা বিচিত্রার অনুসন্ধানে উঠে আসা আরও
চমকপ্রদ তথ্য-উপাত্ত জানতে চোখ রাখুন পরবর্তী সংখ্যায়।