প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সময়: ১২:৪৩ পিএম
ইতালিতে জুলাই যোদ্ধা আজমিরী হক বাঁধন কাণ্ড: বহির্বিশ্বে আমাদের আত্মসম্মান কোথায়?
মোঃ মাইন উদ্দিন :
জুলাই যোদ্ধা আজমেরী হক বাঁধনের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিতে ইতালির ভেনিসে তাঁর ওপর আক্রমণ ও ডিম নিক্ষেপের দৃশ্য দেখা গেছে। ঘটনাটি নিঃসন্দেহে বিব্রতকর। তবে এটিকে শুধু একজন ব্যক্তিকে অপমান কিংবা হেনস্তার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতর তাৎপর্যটি আড়ালে থেকে যাবে। কারণ ঘটনাটি ঘটেছে দেশের বাইরে, একটি ভিন্ন রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে। সেখানে একজন বাংলাদেশির সঙ্গে আরেকজন বাংলাদেশির এমন আচরণ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক সহনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি- তিনটিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা অতীত কর্মকাণ্ডের প্রতি ক্ষোভ থাকতেই পারে। তাঁর বক্তব্য বা অবস্থানের কঠোর সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভ কি কাউকে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পেলেই অপমান করার অধিকার দেয়? মতের বিরোধিতা কি একজন মানুষের মানবিক মর্যাদাকে পদদলিত করার অনুমতিপত্র?
রাজনীতির সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ তখনই সামনে আসে, যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আর মানুষ হিসেবে বিবেচিত হয় না। তখন যুক্তির জায়গা দখল করে ঘৃণা, সমালোচনার জায়গা নেয় অপমান, আর মতপার্থক্য ধীরে ধীরে রূপ নেয় ব্যক্তিগত প্রতিহিংসায়। দেশের রাজনীতিতে এই অসহিষ্ণুতার চর্চা যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি তার রেশ যখন প্রবাসের মাটিতেও পৌঁছে যায়, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ থাকে না- জাতীয় চরিত্রের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি শুধু নিজের পরিচয় বহন করেন না, তাঁর আচরণের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে থাকে বাংলাদেশের নামও। একজন প্রবাসী তাঁর সততা, দক্ষতা, পরিশ্রম ও সৌজন্য দিয়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারেন। আবার তাঁর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ কিংবা তাঁকে ঘিরে সৃষ্ট কোনো অপ্রীতিকর ঘটনাও বিদেশিদের চোখে বাংলাদেশিদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।
তাই বাঁধনকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাটির প্রশ্ন শুধু তাঁকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আরও বড়- আমরা কেমন সমাজ তৈরি করছি? এমন কি একটি সমাজ, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকারকে ছাপিয়ে যাচ্ছে? যেখানে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার পরিবর্তে অপমান করাই যেন রাজনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে উঠছে? আর সেই সংস্কৃতি যদি দেশের সীমানা অতিক্রম করে প্রবাসের মাটিতেও জায়গা করে নেয়, তাহলে আমাদের রাজনৈতিক অসুস্থতার ব্যাপ্তি কতটা গভীর- তা নিয়েও ভাবতে হবে।
আজ একজনকে বিদেশের মাটিতে অপমান করা হলো। কাল একই পরিণতির মুখোমুখি হতে পারেন অন্য কোনো বাংলাদেশি- যিনি হয়তো ভিন্ন মতের, ভিন্ন দলের কিংবা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক একজন মানুষ। তখন আমরা কি বলব? আমরা কি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, তর্ক থাকবে, প্রতিবাদ থাকবে- কিন্তু মানুষের মর্যাদাটুকু অক্ষুণ্ন থাকবে?
এই দায় কোনো একক ব্যক্তি বা একটি রাজনৈতিক দলের ওপর চাপিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এর শিকড় আরও গভীরে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন, প্রতিহিংসা, অসহিষ্ণুতা এবং প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে দেখার অক্ষমতা আমাদের সামাজিক আচরণেও ছাপ ফেলেছে। আমরা যেন ভুলে যাচ্ছি- রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মানেই শত্রু নয়। মতের পার্থক্য মানেই ঘৃণার কারণ নয়।
ঘৃণার রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই- এটি কাউকে একদিনে গ্রাস করে না, ধীরে ধীরে সমাজের স্বাভাবিক বিবেককে অসাড় করে দেয়। প্রথমে কটূক্তি, তারপর অপমান, এরপর আক্রমণ- এভাবেই সহিংসতার সংস্কৃতি স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। আর যখন অন্যায়কে অন্যায় বলে চিহ্নিত করার নৈতিক সাহসটুকুও হারিয়ে যায়, তখন আক্রান্ত ব্যক্তি নয়, শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে জনপরিসরে থাকা বাঁধনদেরও একের পর এক- এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন আছে। যাঁরা কোনো আন্দোলন, রাজনৈতিক ঘটনা কিংবা সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের পরিচয়কে যুক্ত করেছেন, তাঁদের দায়িত্বও সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি। তাঁদের প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি অবস্থান এবং প্রতিটি আচরণের সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তাই জনপ্রিয়তা যেমন দায়িত্ব বাড়ায়, তেমনি জনপরিসরে থাকা প্রতিটি মানুষকেই আরও সংযত, দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী হতে হয়।
তবে একই শিক্ষা আমাদের সবার জন্য। ভিন্নমতকে শত্রুতা না বানিয়ে বিতর্কের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সমালোচনা করতে হবে যুক্তি দিয়ে, প্রতিবাদ করতে হবে শান্তিপূর্ণভাবে এবং অন্যায়ের জবাব দিতে হবে ন্যায়সংগত উপায়ে। কারণ কারও রাজনৈতিক পরিচয় আমাদের অপছন্দ হতে পারে, তাঁর মতাদর্শের সঙ্গে আমাদের তীব্র বিরোধ থাকতে পারে- কিন্তু তাতে তাঁর মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার অধিকার আমরা অর্জন করি না।
বহির্বিশ্বে বাঙালির আত্মসম্মান শুধু বিদেশিদের আচরণের ওপর নির্ভর করে না, অনেকাংশে নির্ভর করে আমরা নিজেদের মধ্যে কেমন আচরণ করি তার ওপর। আমরা যদি দেশের ভেতরেই পরস্পরকে সম্মান করতে না শিখি, তাহলে বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে জাতীয় মর্যাদার কথা বলা কতটা অর্থবহ?
রাজনীতি থাকবে। মতের ভিন্নতা থাকবে। তর্ক থাকবে, প্রতিবাদ থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে- এটাই গণতন্ত্র এবং এর সৌন্দর্য। কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন ঘৃণায় পরিণত না হয়, প্রতিবাদ যেন অপমানের ভাষা না নেয়, আর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন মানবিক মর্যাদাকে গ্রাস না করে।
কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা যে মতেরই হই, যে দলেরই হই, যে রাজনৈতিক পরিচয়ই বহন করি না কেন- বিশ্বের কাছে আমাদের একটি পরিচয়ই সবচেয়ে বড়, আমরা বাংলাদেশি।
আর সেই বাংলাদেশি পরিচয়ের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নয়, কোনো ব্যক্তিরও নয়- এটি আমাদের সবার দায়িত্ব।
বিদেশের মাটিতে তাই প্রশ্নটি শুধু বাঁধনের নয়, আমাদের নিজেদের কাছেই- আমরা কি নিজেদের সম্মান করতে শিখেছি?