প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সময়: ০৯:৫৬ পিএম
বাংলাদেশের বীমা খাতকে বিশ্বমানের করতে কঠোর সংস্কারের ঘোষণা- অর্থমন্ত্রী'র
নুরনবী সোহেল, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
বাংলাদেশের বীমা খাতকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সমপর্যায়ে নিয়ে যেতে সরকার ব্যাপক সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বীমা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশেও বীমা খাত ও এর পেশাজীবীদের সেই অবস্থানে নিয়ে যেতে হবে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বীমা খাতের গুরুত্ব কোনোভাবেই ব্যাংকিং খাতের চেয়ে কম নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন না হওয়ায় এ খাতে বড় ধরনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অনিয়ম তৈরি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের মতো বীমা খাতেও অর্থ লুটপাট ও নানা অনিয়মের কারণে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, বীমার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের দুঃসময়ে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মানুষ কষ্টের উপার্জন থেকে অর্থ জমিয়ে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য বীমা করে। অথচ বর্তমানে বীমা দাবির প্রায় ৫৭ শতাংশ অপরিশোধিত রয়েছে। এটি বীমা খাতের প্রতি গ্রাহকের আস্থার জন্য বড় সংকট।
গ্রাহকের বকেয়া দাবি পরিশোধে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, কোনো কোম্পানির হাতে নগদ অর্থের সংকট থাকলে প্রয়োজনে সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করতে হবে। কারণ বীমা দাবি পরিশোধ করা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির দায়িত্ব। এটি আইডিআরএ চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়। তবে কয়েকটি কোম্পানির পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গ্রাহকের দাবি পরিশোধে তাদের বাধ্য করতে হচ্ছে।
যেসব কোম্পানি সম্পদ বিক্রি করেও গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করতে সক্ষম হবে না, তাদের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ও ডিজিটাল ব্যবস্থা
বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে ‘রিস্ক বেসড সুপারভিশন’ বা ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর কথা জানান অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে প্রতিটি বীমা কোম্পানিকে অটোমেশন ও ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
তিনি বলেন, বীমা কোম্পানির আর্থিক লেনদেন অনলাইনের আওতায় আনা হবে এবং নগদ লেনদেন বন্ধ করা হবে। এ ব্যবস্থার আওতায় আইডিআরএ, বীমা কোম্পানির পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ‘দুই সার্ভার’ ব্যবহারে কঠোর ব্যবস্থা
কিছু বীমা কোম্পানিতে দুটি সার্ভার ব্যবহারের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি প্রকৃত এবং অন্যটি ভুয়া সার্ভার হিসেবে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ধরনের ব্যবস্থা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে সময় দেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের পর পরিদর্শনে গিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানে দুটি সার্ভারের অস্তিত্ব পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
আইডিআরএর নির্দেশনা অমান্যকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান করতে হবে। যারা তা করতে ব্যর্থ হবে, তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দুর্বল কোম্পানি পুনর্গঠনে আইন সংশোধন
বীমা খাতের বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। নতুন আইনি কাঠামোয় দুর্বল কোম্পানির পুনর্গঠন, আর্থিক সংকট এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আইডিআরএর জনবল সংকট নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিতে জনবলের সংখ্যা ও দক্ষতা—দুই ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। বীমা একটি বিশেষায়িত খাত হওয়ায় আইডিআরএতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল প্রয়োজন।
এ লক্ষ্যে আগামী কয়েক বছরে সরকারি প্রেষণে আসা কর্মকর্তার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমিয়ে আইডিআরএর নিজস্ব জনবল কাঠামো গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের পেশাগত দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, আইডিআরএ বর্তমানে যেসব সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বীমা খাতের দীর্ঘদিনের নেতিবাচক ভাবমূর্তি দূর হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠিত হয়ে দেশের বীমা খাত একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও বিশ্বমানের খাতে পরিণত হবে।