প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সময়: ১০:১৪ পিএম
কমলগঞ্জে রিসোর্টের আড়ালে বন-জমি দখলের অভিযোগ, প্রশাসনের তালিকায় অর্ধশতাধিক স্থাপনা
মোঃ শাহাব উদ্দিন আহমেদ শিহাব, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি:
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে পর্যটন ব্যবসার আড়ালে পাহাড়-টিলা, বনাঞ্চল ও সরকারি জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে নামমাত্র পরিমাণ জমি কিনে তার আশপাশের সরকারি খাসজমি, পাহাড়-টিলা ও বনভূমি দখল করে বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণের অভিযোগ করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা। এসব স্থাপনার বৈধতা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ভূমির মালিকানা এবং নির্মাণের অনুমোদন নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাত্র ২ থেকে ৩ শতক ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি কেনাকে ভিত্তি করে আশপাশের সরকারি জমি বা বনাঞ্চলের জায়গা ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ধীরে ধীরে দখলের পরিধি বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন পেশার মানুষের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনার কারণে কমলগঞ্জের পাহাড়-টিলা, বনজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বার্তা বিচিত্রার অনুসন্ধানে কমলগঞ্জের মাধবপুর ইউনিয়নের টিলাগাঁও এলাকায় আম্বার উড ইকো রিসোর্ট ও টিলাগাঁও ইকো ভিলেজ, পুরানবাড়ি এলাকায় বেকইয়ার্ড রিট্রেট ও কারাঞ্জা স্পা রিসোর্ট, ছাতকছড়া এলাকায় সাউন্ড অব সাইলেন্স ও স্বপ্নটিলা ইকো রিসোর্টসহ বিভিন্ন পর্যটন স্থাপনার তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া শমশেরনগর এয়ারবেইজ-সংলগ্ন এলাকায় ‘ছুটি’ নামের একটি রিসোর্ট এবং নুরজাহান সড়কের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘেঁষে গড়ে ওঠা আরও কয়েকটি রিসোর্ট নিয়েও সচেতন মহলের প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পুরো উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় অর্ধশতাধিক কটেজ ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। তবে এসব স্থাপনার মধ্যে কতগুলো বৈধ অনুমোদন নিয়ে নির্মিত এবং কতগুলোর ভূমির মালিকানা ও পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও নথিপত্র সরকারি দপ্তরে নেই।
অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ভূমির মালিকানা নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু রিসোর্ট মালিক প্রথমে ব্যক্তিমালিকানাধীন অল্প পরিমাণ জমি কিনছেন। পরে সেই জমির সঙ্গে লাগোয়া সরকারি খাসজমি, বনভূমি কিংবা পাহাড়-টিলার অংশ দখল করে ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। এভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি ও সরকারি জমির সীমানা ধীরে ধীরে একাকার হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কোথাও পাহাড়ের ঢাল কেটে স্থাপনা নির্মাণ, কোথাও গাছপালা ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ অপসারণ এবং কোথাও রাস্তা নির্মাণের জন্য ভূমির আকৃতি পরিবর্তনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বার্তা বিচিত্রার অনুসন্ধান ও আরো জানা যায়, দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এসব রিসোর্ট ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। তাঁদের মধ্যে সরকারি আমলা, কর্মকর্তা, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রকৌশলী এবং বিনোদন অঙ্গনের ব্যক্তিদের নামও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হচ্ছে। স্থানীয়রা এসব বিনিয়োগের অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন এবং রিসোর্ট ব্যবসার আড়ালে অবৈধ অর্থ বৈধ করার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
রিসোর্ট স্থাপনের ক্ষেত্রে ভূমির শ্রেণি, নির্মাণ অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, বনভূমির অবস্থান এবং স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতির বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কমলগঞ্জে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনার কতটির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে, তার সমন্বিত কোনো তালিকা সরকারি কোন দপ্তরে পাওয়া যায়নি।
কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য রিসোর্টগুলোর একটি তালিকা তৈরির কথা জানানো হয়েছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “কে রিসোর্ট করছে, কে অনুমতি দিচ্ছে—এসব আমার জানা নেই। রিসোর্টের বিষয় নিয়ে আমাদের আরও চিন্তা করা উচিত। আমরা ইতিমধ্যে একটা তালিকা করেছি। রিসোর্ট তৈরির জন্য একটা নীতিমালা করা দরকার। সবকিছু মিলিয়ে একটা প্রজ্ঞাপন করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।”
উপজেলা প্রশাসনের এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, রিসোর্ট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদন ব্যবস্থায় সমন্বিত নীতিমালার ঘাটতি রয়েছে।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়-টিলা কেটে বা বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিবর্তন করে পর্যটন স্থাপনা গড়ে উঠলে শুধু গাছপালা ধ্বংসই হয় না; পাহাড়ের মাটি ক্ষয়, জলাধারের স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলসহ বিস্তৃত প্রাকৃতিক এলাকার কারণে এ উপজেলার পরিবেশগত গুরুত্বও রয়েছে। ফলে যেকোনো পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব এবং ভূমির আইনগত অবস্থান যাচাই জরুরি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, বছরের পর বছর ধরে এসব স্থাপনা নির্মাণ ও পরিচালিত হয়ে থাকলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর নজরদারি আসলে কোথায়?
জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত তদারকি ছাড়া সরকারি জমি বা বনাঞ্চলের সীমানা ঘেঁষে বড় ধরনের স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করা কঠিন। একই সঙ্গে অনুমোদনবিহীন স্থাপনা থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে এসব রিসোর্টের অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং মালিকানার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও সব স্থাপনার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অভিযোগ সত্য হলে সরকারি জমি ও বনাঞ্চল উদ্ধারের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর যেসব রিসোর্ট বৈধ জমিতে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোকেও স্বচ্ছ তালিকার আওতায় আনা উচিত।
কমলগঞ্জের প্রকৃতি, বনাঞ্চল ও পাহাড়-টিলা রক্ষায় দ্রুত একটি সমন্বিত সরকারি জরিপ এবং প্রকাশ্য তালিকা তৈরির দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে রিসোর্ট ব্যবসায় বিনিয়োগ করা অর্থের উৎস সংশ্লিষ্ট আর্থিক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে যাচাইয়েরও দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন সমাজ।
প্রশ্ন এখন একটাই—কমলগঞ্জের পাহাড়, বন ও সরকারি জমির সুরক্ষা নিশ্চিত করে পর্যটন উন্নয়ন হবে, নাকি পর্যটনের নামে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ?