পুরনো আতঙ্ক: রাত নামলেই অনিরাপদ ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়ক

মোঃ মাইন উদ্দিন :

ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়ক কিশোরগঞ্জের বৃহৎ একটি অঞ্চলের মানুষের চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। অথচ রাত নামার পর এই সড়ক ও আশপাশের কিছু এলাকায় ছিনতাই-ডাকাতির অভিযোগ নতুন করে জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কুলিয়ারচরের দুটি পৃথক স্থানে ছিনতাইয়ের অভিযোগের ঘটনায় নিরাপদ সড়ক চলাচল নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে উপজেলার আগরপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায়। শেরপুরের এক যুবক মোটরসাইকেলে ভৈরব থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে ইসরাতুল জান্নাত কওমি মহিলা মাদ্রাসার কাছে পৌঁছালে কয়েকজন ব্যক্তি সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে তাঁর পথরোধ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে মোটরসাইকেল নিয়ে তারা পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।

এর প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর শুক্রবার রাত ৯টার দিকে গোবরিয়া-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের উত্তর লক্ষ্মীপুর রাজগোপাট সড়কে রিমন মিয়া নামের এক যুবক ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন অস্ত্রধারী তাঁর চোখ বেঁধে মারধর করে নগদ ১০ হাজার টাকা ও সঙ্গে থাকা মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে তাঁকে রাস্তায় ফেলে যায়। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এর বাইরে ফরিদপুর-আকবরনগর সড়কের ছয়সূতী ইউনিয়নের হাঁপানিয়া এলাকায় বাবুর বাড়ির কাছে গাছ ফেলে ব্যারিকেড তৈরি করে ডাকাতির চেষ্টার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কথাও জানা গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কুলিয়ারচরের বিভিন্ন সড়কে রাতের বেলায় ছিনতাই ও ডাকাতির আশঙ্কা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়কের নির্জন অংশে ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহন থামিয়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগ নতুন নয়, অনেক পুরনো। কিন্তু গত দুইযোগ ধরে এ ধরনের ঘটনা তেমন শোনা যায়নি বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন। ফলে পুরনো অভিযোগ নতুন করে সামনে আসায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ সড়ক অনিরাপদ হয়ে পড়লে শুধু যাত্রীদের চলাচলই বাধাগ্রস্ত হয় না, এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাভাবিক সামাজিক কর্মকাণ্ডেও।

কিন্তু অভিযোগ আর প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। কুলিয়ারচর থানার ওসি মোজাম্মেল হক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এসব ঘটনায় দুই-তিন দিন পার হলেও কোনো ভুক্তভোগী থানায় লিখিত অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। পুলিশের এই বক্তব্যও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ভুক্তভোগীদের থানায় অভিযোগ করা এবং পুলিশকে দ্রুত তদন্তের সুযোগ দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনাও প্রয়োজন।

তবে প্রশ্ন হলো, রাতের সড়কগুলো নিরাপদ রাখতে কার্যকর নজরদারি কতটা রয়েছে? ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে নিয়মিত পুলিশ টহল, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা জোরদার করা যেতে পারে। বিশেষ করে অতীতে এ ধরনের অভিযোগ থাকা এলাকাগুলোতে বাড়তি নজরদারি থাকলে অপরাধের সুযোগ কমানো সম্ভব।

একটি জনসড়ক রাত হলেই সাধারণ মানুষের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠবে, এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রোগী কিংবা সাধারণ যাত্রী- সবারই দিনের পাশাপাশি রাতেও নিরাপদে চলাচলের অধিকার রয়েছে। তাই সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোকে আতঙ্ক ছড়ানোর বিষয় হিসেবে না দেখে আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধের সুযোগ তৈরি হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়কসহ কুলিয়ারচরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কার্যকর নজরদারি বাড়ানো গেলে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে হয়। এখানে প্রশ্ন শুধু একটি সড়কের নিরাপত্তার নয়- প্রশ্ন হলো, রাতে সাধারণ মানুষ তাঁর পথটুকু নিরাপদে পাড়ি দিতে পারবেন কি না।