প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬
সময়: ১০:০৭ পিএম
তিতাস গ্যাসের কালোবাজার ! অবৈধ সংযোগ, মিটার কারসাজি, সিস্টেম লস ও বিল বকেয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ বিতরণব্যবস্থা
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্যাস। অথচ এই সম্পদ বিতরণের দায়িত্বে থাকা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কার্যক্রমে বছরের পর বছর ধরে উঠে এসেছে অবৈধ সংযোগ, বিচ্ছিন্ন সংযোগ পুনঃস্থাপন, মিটার কারসাজি, গ্রাহক শ্রেণি পরিবর্তন, অস্বাভাবিক সিস্টেম লস, বিল আদায়ে গাফিলতি এবং ঠিকাদারি অনিয়মের চিত্র। সরকারি তদন্ত, নিরীক্ষা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে এসব অনিয়মের বিভিন্ন দিক চিহ্নিত হওয়ার পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও সেগুলো কীভাবে আবার ফিরে আসে, মিটারে কারসাজি হলে তা শনাক্ত ও প্রতিরোধে ব্যবস্থা কোথায় এবং বছরের পর বছর অস্বাভাবিক সিস্টেম লস থাকলে এর দায় কার?
তিতাসের বিতরণ এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও অনেক এলাকায় পুনরায় অবৈধ সংযোগের সন্ধান মিলেছে। এতে শুধু গ্রাহকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যার সমাধান না হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। একটি অবৈধ সংযোগ স্থাপনে পাইপলাইন, ভালভ ও কারিগরি সহায়তার প্রয়োজন হওয়ায় এর পেছনে স্থানীয় দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা সংশ্লিষ্ট কারিগরি চক্রের ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। একই এলাকায় বারবার অবৈধ সংযোগ পাওয়া গেলে আগের বিচ্ছিন্নকরণ তালিকা, নতুন সংযোগের অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
বিচ্ছিন্ন করা সংযোগ পুনরায় চালু হওয়া তিতাসের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোনো সংযোগ পুনঃস্থাপনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অনুমোদন ও পরিদর্শন প্রক্রিয়া থাকার কথা। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার বাইরে সংযোগ চালু হলে রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিও প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিচ্ছিন্ন সংযোগের তালিকা, পুনঃসংযোগের অনুমোদন, মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং পরবর্তী বিলিং রেকর্ড পাশাপাশি বিশ্লেষণ করা হলে এ ধরনের অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
গ্যাস ব্যবহারের হিসাব নির্ধারণে মিটার প্রধান ভিত্তি। ফলে মিটার রিডিং কম দেখানো, মিটার পরিবর্তনে অনিয়ম বা মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় কম বিল তৈরি হলে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিতাসের মিটার-সংক্রান্ত অনিয়মও সরকারি পর্যায়ের অনুসন্ধানে চিহ্নিত হয়েছে। কোনো গ্রাহকের মিটার কখন পরিবর্তন হয়েছে, পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে এবং পরিবর্তনের আগে ও পরে বিলের পরিমাণে কী পরিবর্তন এসেছে, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে মিটার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস ব্যবহার ও উৎপাদনের তথ্য পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে অস্বাভাবিকতা সহজে শনাক্ত করা সম্ভব।
আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকের গ্যাস বিলিং কাঠামো এক নয়। ফলে গ্রাহকের শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে কম হারে বিল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোন গ্রাহকের শ্রেণি কখন পরিবর্তিত হয়েছে, কে অনুমোদন দিয়েছে, মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন হয়েছিল কি না এবং পরিবর্তনের আগে ও পরে বিলের পরিমাণে কী পার্থক্য হয়েছে, এসব তথ্য যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে বড় গ্রাহকের শ্রেণি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
তিতাসের রাজস্ব ক্ষতির অন্যতম বড় প্রশ্ন সিস্টেম লস। গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় কিছু কারিগরি ক্ষতি স্বাভাবিক হলেও কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক মাত্রার ব্যবধান থাকলে তার কারণ নির্ধারণ জরুরি। তিতাস কত গ্যাস গ্রহণ করছে এবং গ্রাহকদের কত গ্যাস বিল করছে, এই দুই হিসাবের পার্থক্য বিশ্লেষণ করলেই সিস্টেম লসের চিত্র পাওয়া সম্ভব। জোনভিত্তিক সিস্টেম লসের তথ্যের সঙ্গে অবৈধ সংযোগ, অভিযান এবং বিলিং রেকর্ড মিলিয়ে দেখলে কোথায় অস্বাভাবিক ক্ষতি হচ্ছে তা শনাক্ত করা সম্ভব।
তিতাসের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের বকেয়া বিলও বড় প্রশ্ন। বড় গ্রাহকের বিপুল অঙ্কের বিল বকেয়া থাকার পরও সংযোগ চালু থাকলে বকেয়া আদায়ে প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বকেয়া শুরুর সময়, মোট বকেয়া, নোটিশ, সংযোগ বিচ্ছিন্নের উদ্যোগ এবং বাস্তবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে কি না, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে বড় বকেয়াদারদের বিষয়ে তিতাসের ভূমিকা স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন বকেয়া থাকা কোনো গ্রাহক বিশেষ সুবিধায় সংযোগ চালু রেখেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শিল্পকারখানায় অনুমোদিত বয়লার ও জেনারেটরের তুলনায় অতিরিক্ত যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও তিতাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারি পর্যায়ের অনুসন্ধানে অতিরিক্ত বয়লার ও জেনারেটরে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিষয়টি অনিয়মের ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উঠে এসেছে। তিতাসের অনুমোদিত গ্যাস লোড, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব উৎপাদন এবং ব্যবহৃত বয়লার ও জেনারেটরের সংখ্যা মিলিয়ে দেখলে অতিরিক্ত গ্যাস ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
বড় গ্রাহকের প্রকৃত গ্যাস ব্যবহার নির্ধারণে Electronic Volume Corrector বা EVC গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো গ্রাহকের EVC না থাকা, অকার্যকর থাকা কিংবা EVC -এর তথ্যের সঙ্গে বিলিং রেকর্ডের অসামঞ্জস্য থাকলে প্রকৃত গ্যাস ব্যবহার নিরূপণে সমস্যা তৈরি হয়। ফলে বড় গ্রাহকদের EVC স্থাপন, কার্যকারিতা এবং বিলিং ডেটার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য পরীক্ষা করাও জরুরি।
তিতাসের পাইপলাইন নির্মাণ, মেরামত ও বিভিন্ন কারিগরি কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত। এসব কাজে একই প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পাচ্ছে কি না, দরপত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতা হয়েছে কি না, কার্যাদেশের মূল্য ও বাস্তব কাজের পরিমাণের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। প্রাক্কলন, দরপত্র, কার্যাদেশ, বিল এবং বাস্তবে সম্পন্ন কাজের পরিমাণ মিলিয়ে দেখলে ঠিকাদারি খাতে অনিয়মের সম্ভাব্য চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
তিতাসের বিতরণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি ধাপেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুমোদন ও তদারকি রয়েছে। ফলে কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন অবৈধ সংযোগ থাকা, একই সংযোগ বারবার ফিরে আসা কিংবা অস্বাভাবিক সিস্টেম লসের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সময়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা পরীক্ষা করা জরুরি। কোনো অনিয়মের ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কিংবা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকলে তার ফলাফলও জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন। কারণ দায় নির্ধারণ ছাড়া শুধু অভিযান পরিচালনা করলে অনিয়মের মূল উৎস বন্ধ করা সম্ভব নয়।
তিতাসের অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বের করতে সংযোগ, মিটার, বিলিং, বকেয়া, সিস্টেম লস এবং ঠিকাদারি কাজের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জোনভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করা হলে কোন এলাকায় কী ধরনের অনিয়ম বেশি এবং কোথায় রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি বেশি, তা সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাই সমাধান নয়; এর উৎস বন্ধ করা, পুনঃসংযোগের পথ রুদ্ধ করা, মিটার ও বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং অস্বাভাবিক সিস্টেম লসের দায় নির্ধারণ করাই হতে পারে কার্যকর সমাধান।
জাতীয় সম্পদ রক্ষায় তিতাসের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা নয়, বরং অবৈধ সংযোগের উৎস বন্ধ করা, রাজস্ব ফাঁকির পথ রুদ্ধ করা এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি স্তরের দায় নির্ধারণ করা। গ্যাসের প্রতিটি অবৈধ সংযোগ রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং জনগণের অর্থের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই তিতাসে প্রয়োজন নিয়মিত অভিযাননির্ভর কার্যক্রমের পাশাপাশি নথিভিত্তিক স্বচ্ছতা, কঠোর জবাবদিহি এবং স্থায়ী সংস্কার।