প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬
সময়: ১০:৩৭ পিএম
গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব, আর্থিক অনিয়ম ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী (অডিট) মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে পদায়ন ও পদোন্নতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা, সরকারি অর্থের অনিয়ম, শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে অসঙ্গতি, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ নেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের মধ্যে সরকারি নথি, দাপ্তরিক চিঠিপত্র, আদালতের মামলা ও তদন্ত-সংক্রান্ত নথির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার দাবি রয়েছে।
মোয়াজ্জেম হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের দেওয়া একটি প্রত্যয়নপত্রে তাঁকে দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ২০১৮ সালে তৎকালীন মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তাঁর পদায়ন বা পদোন্নতির জন্য ডিও দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সরকারি চাকরিতে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচ্য হলেও রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশ ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে নিজের পদায়ন কিংবা পদোন্নতিতে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন মোয়াজ্জেম হোসেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির নথি পর্যালোচনা করলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তবে রাজনৈতিক পরিচয় থাকা বা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সুপারিশ পাওয়া নিজেই অনিয়মের প্রমাণ নয়; বরং সেই প্রভাব প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বেআইনি সুবিধা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি অর্থের অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। ২০১২ সালে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ৩ হাজার ৯২৯ টাকা সরকারি অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। শুধু অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ নয়, ওই অর্থ পরবর্তীতে ফেরত দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় বিল-ভাউচারের যথার্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সময়ের বিল, ভাউচার, মাপবই, অনুমোদন এবং অর্থ উত্তোলনের নথি যাচাই করা হলেই এর সত্যতা বের হয়ে আসবে।
এছাড়া তাঁর দায়িত্ব পালনের সময় শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি কম দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একই শ্রমিকের নাম একাধিকবার ব্যবহার করে মজুরি বা অর্থ প্রদানের হিসাব দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। যা শুধু শ্রমিকদের আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়, সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মেরও ইঙ্গিত দেয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের হাজিরা খাতা, মজুরি শিট, শ্রমিকদের প্রকৃত উপস্থিতি এবং অর্থ পরিশোধের নথি যাচাই করা জরুরি।
দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে কৈফিয়ত বা কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি হয়েছিল বলেও তথ্য রয়েছে। কোন অভিযোগের ভিত্তিতে ওই নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, তিনি কী জবাব দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মোয়াজ্জেম হোসেন অগ্রণী ব্যাংকের অর্থ ঋণ মামলা নং ৯০/২০১০-এ বিবাদী ছিলেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। ওই মামলায় ২ লাখ ৬ হাজার ৫৪১ টাকা পরিশোধের জন্য আদালত থেকে সমন জারি হয়েছিল বলে জানা গেছে। মামলাটির পরবর্তী অবস্থা, অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল কি না এবং আদালতে এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কীভাবে হয়েছে, তা আদালতের নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি তদন্ত প্রতিবেদন। ওই প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় মোয়াজ্জেম হোসেনকে পদায়ন না করার সুপারিশ করা হয়েছিল। যদি তদন্ত প্রতিবেদনে সত্যিই এমন সুপারিশ থেকে থাকে, তাহলে কোন অভিযোগ বা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি এ ধরনের সুপারিশ করেছিল, তা প্রকাশ্যে আসা জরুরি।
এর বাইরে একাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকারি কাজের সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন সময়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে তাঁদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়নি এবং নেওয়া অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বক্তব্যের পাশাপাশি অর্থ লেনদেনের নথি, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেন, টেন্ডার নথি ও কার্যাদেশ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশিত হবে।
একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার, পদায়ন ও পদোন্নতিতে তদবির, সরকারি অর্থের অনিয়ম, শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে অসঙ্গতি, দাপ্তরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার মতো একাধিক অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযোগের বিষয়ে মোয়াজ্জেম হোসেনের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে এ বিষয়ে সরাসরি বক্তব্য নেওয়ার জন্য প্রতিবেদক তার দপ্তরে গিয়ে সাক্ষাতের চেষ্টা করলেও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা সম্ভব হয়নি।