আজিমপুরে “মঞ্জিল-ই-মোবারক” ভবনের চতুর্থ তলার ছাদ থেকে রড পড়ে পথচারী গুরুতর আহত, অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন আরেকজন

 

নিজস্ব প্রতিবেদক:

 

রাজধানীর লালবাগ থানাধীন আজিমপুর, বটতলা এলাকায় “মঞ্জিল-ই-মোবারক” নামক একটি পুরোনো ভবনের নির্মাণাধীন ৪ তলার ছাদ থেকে নিচে লোহার রড পড়ে মো. সামসুদ্দিন (৫৫) নামে এক পথচারী গুরুতর আহত হয়েছেন। একই ঘটনায় তার ঠিক পেছনে থাকা আরেক পথচারী রমজান আলী (৫০) অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন। গত ২১ সেপ্টেম্বর (সোমবার) দুপুর ১২টার দিকে এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই একটি গলির ভেতরে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভবন নির্মাণের চরম অবহেলাকে এই দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

 

প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৭ সালে রাজউকের (তদানীন্তন ডিআইটি) অনুমোদিত তিনতলা আবাসিক এই ভবনটির নকশা অনুযায়ী প্রথম তলার নির্মাণ কাজ করা হয়। পরবর্তীতে পুরোনো কাঠামোর ১০ ইঞ্চি ভারবহনকারী দেয়ালের (Load-bearing wall) ওপর অনুমোদিত নকশার বাইরে ছাদের পরিসর বাড়িয়ে ২০০৪ ও ২০০৭ সালে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয়। ভবনটিতে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রতি তলায় দুইটি করে ইউনিট রাখার নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী প্রথম তলায় দুইটি ইউনিট করলেও, পরবর্তীতে ২য় ও ৩য় তলায় ছাদের পরিমাণ বাড়িয়ে তিনটি করে ইউনিট তৈরি করা হয়।

 

অন্যদিকে আবাসিক ভবন হিসেবে অনুমোদিত “মঞ্জিল-ই-মোবারক” নামক ভবনটি দীর্ঘদিন যাবত বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এখানে “মায়ের আদর ছাত্রী নিবাস” নামে মেস/ছাত্রী হোস্টেলের রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছেন ভবন মালিক মো. মনিরের ঘনিষ্ট সাইফুদ্দিন আহমেদ সফিক ও কুমকুম আহমেদ নামের এক দম্পতি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এলাকায় আরও অনেকগুলো আবাসিক ভবনে তাদের এই ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। রাজউক, সিটি কর্পোরেশন, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসনের সকল বিধি-বিধান উপেক্ষা করে “অনলাইন ও অফলাইনে প্রচারের মাধ্যমে” তারা এই কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। এর ধারাবাহিকতায় অধিক মুনাফার লোভে সাধারণ ১০ ইঞ্চি দেয়ালের ওপর নির্মিত ৫০ বছরের প্রাচীন তিন তলা ভবনের ওপর অনুমোদনহীন ৪র্থ তলা নির্মাণে তারা বাড়িওয়ালা মনিরের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। সে অনুযায়ী ইটের গাঁথুনিসহ ৪র্থ তলা নির্মাণের মূল কাজও সম্পন্ন করেন তারা। কিন্তু ছাদ ঢালাইয়ের প্রাক্কালে গত ১৮ আগস্ট (মঙ্গলবার) রাজউকের হস্তক্ষেপে তাদের এই অবৈধ কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

 

তবে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, রাজউকের নির্দেশনা কার্যকর হওয়ার পরও সংশ্লিষ্টরা নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার বিভিন্ন উপায় খুঁজছিলেন। তাই সফিক-মনির জুটি গত প্রায় এক মাস ধরে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বিভিন্ন চেষ্টা-তদবির করলেও তাদের এই অবৈধ কাজের সমর্থন পাননি কোথাও। পরে বাধ্য হয়ে ছাদের রড নামিয়ে শাটারিং-সেন্টারিং খুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন, এবং দেয়াল অঙ্কিত রুম, বাথরুম, কিচেন ও বারান্দারগুলো ওভাবেই রেখে দেবেন বলে স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সূত্রে আরও জানা যায় যে, পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে যেকোনো উপায়ে বাধা-বিপত্তি ‘ম্যানেজ’ করার মাধ্যমে ঐ অবস্থায় ইটের গাঁথুনির ওপর টিনশেড দিয়ে হলেও রাজউকের নিয়ম-নীতিকে উপেক্ষা করে ৪র্থ তলার কাজ সম্পন্ন করবেন তারা। এ বিষয়ে ভবন মালিক মনিরের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

 

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই চক্রটি ভবন নির্মাণে ইতোমধ্যে যতটুকু অবৈধ কাজ করেছেন, এবং আরও একটি অবৈধ কাজ (টিনশেডের ৪র্থ তলা) করবার মানসে ঢালাইয়ের জন্য প্রস্তুত করা রড খুলে নিচে নামানোর সময় পর্যন্ত তাদের কাজের কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না, এখনও নেই। বিশেষজ্ঞ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের মতে, “দুর্ঘটনা কেবল একটি সাধারণ অসাবধানতা নয়, বরং দেশের প্রচলিত ইমারত নির্মাণ আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।” বাংলাদেশ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (২০০৮) এবং বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুযায়ী ভবন নির্মাণের সময় ঘনবসতিপূর্ণ ও সরুরাস্তার এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের চারপাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী (Safety Net) এবং পথচারীদের সুরক্ষার জন্য প্রতিরক্ষামূলক ছাউনি বা ‘ক্যানোপি’ দেওয়া বাধ্যতামূলক। এই ভবনে এর কোনোটিই ছিল না। স্থানীয়দের মতে, নিরাপত্তা ঘাটতির ফলেই ২১ সেপ্টেম্বরের দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।

 

ঘটনার দিন এলাকার ৩৮ নং গলির নিরাপত্তা প্রহরী মো. সামসুদ্দিন ও স্থানীয় এক বাড়িওয়ালা মো. রমজান আলী গলির ভেতর থেকে হেঁটে আসছিলেন। নির্মাণাধীন ভবন “মঞ্জিল-ই-মোবারক” অতিক্রম করার সময় হঠাৎ তাদের কানে ভেসে আসে ধাতব ঝনঝন-টনটন শব্দ। ওপরে চোখ যেতেই ঠিক তাদের মাথা বরাবর, আনুমানিক ২০/২৫ পিসের এক বান্ডিল রড, দড়ি ছিঁড়ে বৈদ্যুতিক তারের সাথে বাড়ি খেতে দেখতে পান। দ্রুত সরে গিয়ে তারা প্রাণে রক্ষা পেলেও সামসুদ্দিনের হাত গুরুতর আহত হয়। ওপরে দড়ি ছেঁড়া বৈদ্যুতিক তারে ঝুলন্ত রডের বান্ডিল থেকে বেশ কয়েকটি ৩/৪ ফুট লম্বা রড মুহূর্তেই নিচে পড়ার সময় সামসুদ্দিনের হাতের আঙ্গুল মারাত্মক জখম করে দেয়।

 

এ বিষয়ে ঐ বাড়িওয়ালা রমজান আলী বলেন, “এক সেকেন্ডের মধ্যে ঘটনাটি ঘটে যায়। একটু এদিক-সেদিক হলে খাড়া রড সোজা মাথায় ঢুকে মারা যেতাম, আল্লাহ বাঁচায় দিছে।” তিনি আরও বলেন, “একজন শ্রমিক চার তলার ওপর থেকে এতগুলো রড নামাচ্ছে, অথচ নিচে তাদের কেউ নেই। গলিতে বাচ্চারা অনেক সময় ছোটাছুটি করে, মহিলারা আসা-যাওয়া করে, এমন সময় এই দুর্ঘটনা ঘটলে তারাতো কিছুই বুঝতে পারতো না। তাহলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারত, তা সহজেই অনুমেয়।” ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “শুরু থেকেই কোনো রকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া তারা যেভাবে কাজ করছেন, তাতে এখানকার বাসিন্দাদের কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা ওপর থেকে রডের বান্ডেল পড়ে কেউ মারা গেলে, তারা কীভাবে এর ক্ষতিপূরণ দিতেন? তাছাড়া এত পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি তিন তলা ভবনের ওপর অননুমোদিত চতুর্থ তলা নির্মাণ করার সাহসই-বা তারা পান কোথা থেকে?”

 

এদিকে দুর্ঘটনার পর খবর পেয়েও ঘটনাস্থলে আসেননি ভবন নির্মাণের অন্যতম অংশীদার সাইফুদ্দিন আহমেদ সফিক। উল্টো মুঠোফোনে তাদের এক শ্রমিককে নির্দেশনা দেন, আহত সামসুদ্দিনকে স্থানীয় কোনো ফার্মেসিতে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিতে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী, আজিমপুর বটতলা সুপার মার্কেটের নিচতলায় একটি ফার্মেসিতে সামসুদ্দিনের জখম হওয়া হাতে একাধিক সেলাই (স্টিচ) দিয়ে, ব্যান্ডেজ করে, কিছু ঔষুধ ও একটি ইনজেকশন প্রয়োগের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। চার দিন পার হলেও অবস্থা উন্নতির দিকে না গিয়ে, বরং তার হাতটি প্রচন্ড ফুলে যায় এবং শরীরে তীব্র জ্বর আসে। এ সময় পর্যন্ত মালিক বা ভবন নির্মাণকারী পক্ষের কেউ তার কোনো খোঁজখবর নেয়নি বলে জানা যায়। এ অবস্থায় সারাক্ষণ এক অজানা আতঙ্ক তাড়া করে বেড়ায় ভুক্তভোগী এই নিরাপত্তা প্রহরীকে।

 

পরবর্তীতে বিষয়টি তার এক শুভাকাঙ্ক্ষীর নজরে এলে তিনি নিজ উদ্যোগে সামসুদ্দিনকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যায়ে (BSMMU) বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। সেখানে এক্স-রে রিপোর্ট দেখে ডাক্তার তার ব্যবস্থাপত্রে লেখেন, “dorsum of left hand” এবং “4 days old # neck of the 5th metacarpal” যার অর্থ, “বাম হাতের পেছনের অংশে ৫ম মেটাকার্পাল হাড়ের ঘাড়ে চার দিন আগের একটি হাড় ভাঙা (ফ্রাকচার) রয়েছে।” পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় অবহেলার অভিযোগ রয়েছে, যা ভুক্তভোগীর শারীরিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

 

এলাকার বিভিন্ন আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিকভাবে চলমান “মায়ের আদর ছাত্রী নিবাস” বিষয়ে বার্তা বিচিত্রা পত্রিকায় ইতোমধ্যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। নিজস্ব বিজ্ঞাপনে প্রতিষ্ঠানটিকে “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ দ্বারা পরিচালিত” বলে দাবি করা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, “মায়ের আদর ছাত্রী নিবাস” নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, নিবন্ধন কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কর্যক্রমের বৈধতা এবং সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সচেতন মহলের পক্ষ হতে এ বিষয়ে খতিয়ে দেখার দাবি ওঠায় “মায়ের আদর ছাত্রী নিবাস” বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থাকছে পরবর্তী সংখ্যায়।