শুধু একজন মেয়ের হাতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুখে কালি লাগানোর ঘটনা দেখেই যদি আমরা বিষয়টি শেষ করে দিতে চাই, তাহলে হয়তো মূল সমস্যাটিই আড়ালে থেকে যাবে। কারণ এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এর পেছনে লুকিয়ে থাকা মানসিকতা আরও গভীর এবং উদ্বেগজনক। গত কয়েক বছরে আমাদের সমাজে এমন একটি প্রজন্মের উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে, যারা কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে।
রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন কবি নন। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ, আমাদের সংস্কৃতি ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর সৃষ্টিকে পছন্দ না করা ব্যক্তিগত রুচির বিষয় হতে পারে, কিন্তু একজন কবির প্রতিকৃতি বিকৃত করা, অপমান করা কিংবা শিল্প-সাহিত্যকে ঘৃণার চোখে দেখা কোনো সুস্থ সাংস্কৃতিক মানসিকতার পরিচয় নয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের প্রবণতা শুধু অশিক্ষিত বা প্রান্তিক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও কখনো কখনো এমন চিন্তার প্রকাশ দেখা যায়। এমনকি উচ্চশিক্ষিত এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কিছু মানুষের বক্তব্যে এবং আচরণেও শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা বা অসহিষ্ণুতার ছাপ দেখা যায়। বিষয়টি তাই ব্যক্তিগত আচরণের গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবেও ভাবার দাবি রাখে।
শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু একটি সনদ অর্জন নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের চিন্তাকে উদার করে, ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখায়, সৌন্দর্য ও মানবিকতার প্রতি সংবেদনশীল করে। একজন মানুষ অনেক ডিগ্রি অর্জন করেও যদি অন্যের সাহিত্য, শিল্প বা সংস্কৃতির অস্তিত্বকে সহ্য করতে না পারেন, তাহলে আমাদের সামনে এমন প্রশ্ন আসতেই পারে- আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত হচ্ছি, নাকি শুধু শিক্ষার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করছি?
কোনো সাহিত্যিকের লেখা ভালো না লাগতেই পারে। কোনো শিল্পীর শিল্পকর্ম পছন্দ নাও হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য নিয়েও কারও সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু সমালোচনা আর অবমাননা এক জিনিস নয়। মতের বিরোধিতা যুক্তি দিয়ে করা যায়, শিল্পের জবাব দেওয়া যায় আরও ভালো শিল্প দিয়ে। কিন্তু কালি দিয়ে মুখ ঢেকে দেওয়া, ভাঙচুর করা কিংবা ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়া কোনো যুক্তির ভাষা হতে পারে না।
সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, যখন একটি প্রজন্ম শিল্প-সংস্কৃতিকে অপ্রয়োজনীয় কিংবা পাপ হিসেবে দেখতে শুরু করে। কারণ যে সমাজ কবিতা, গান, সাহিত্য, নাটক, চিত্রকলা ও মুক্তচিন্তাকে ভয় পায়, সে সমাজ ধীরে ধীরে তার সৃজনশীলতা ও মানবিকতা হারাতে থাকে।
তাই রবীন্দ্রনাথের মুখে কালি দেওয়ার ঘটনায় শুধু এই নারী বা এক-দুই ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না। আমাদের ভাবতে হবে, কোন পরিবেশে এমন মানসিকতা তৈরি হচ্ছে? পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সাংস্কৃতিক পরিসর এবং রাষ্ট্রীয় নীতির কোথাও কি আমাদের ঘাটতি রয়েছে?
একজন মেয়ের হাতে কালি দেখা গেছে কিন্তু সেই কালি যদি আমাদের সমাজের বৃহত্তর একটি মানসিকতার প্রতিচ্ছবি হয়, তাহলে আয়নাটিও আমাদের নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে তাকাতে হবে।
রবীন্দ্রনাথের মুখে দেওয়া কালি মুছে ফেলা সম্ভব। কিন্তু একটি প্রজন্মের চিন্তা থেকে অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষ ও সংস্কৃতিবিমুখতার কালো দাগ মুছে ফেলা অনেক কঠিন। তাই এখনই প্রশ্ন তোলা দরকার- আমরা আমাদের সন্তানদের শুধু শিক্ষিত করছি, নাকি সত্যিকার অর্থে মানুষও করে তুলছি?