নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে শুরু হয়েছে পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্য নারী পরিবারপ্রধানদের ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতার আওতায় আনা হবে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুর ২টার দিকে কুলিয়ারচর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করতে প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সভায় কর্মসূচির লক্ষ্য, তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি, উপকারভোগী নির্বাচন এবং ভাতা প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
প্রেস কনফারেন্সে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাফফাত আরা সাঈদ। তিনি জানান, চলতি বছরের ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলটিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। জুন পর্যন্ত দেশের ৮টি বিভাগের ৪৪টি জেলার ৫৫টি উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ইউনিটে ১ লাখ ১২ হাজার ৯৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) স্কোরের ভিত্তিতে ৭১ হাজার ৮৩১ জনকে যোগ্য উপকারভোগী হিসেবে নির্বাচন করে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়া হয়েছে।
পাইলটিং পর্যায়ে বরাদ্দ ছিল ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, যার ৫৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ভাতা হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।
ইউএনও বলেন, জুলাই ২০২৬ থেকে দেশব্যাপী কর্মসূচিটির মূল বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ কর্মসূচির জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সরাসরি ভাতা প্রদানের জন্য নির্ধারিত। কর্মসূচি বাস্তবায়নে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০২৬- প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ প্রক্সি মিনস টেস্ট বা পিএমটি পদ্ধতির মাধ্যমে দেশের পরিবারগুলোকে আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো- অতিদরিদ্র, দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। পিএমটি স্কোর অনুযায়ী ৮৬০ বা তার কম নাম্বার পাওয়া নারী পরিবারপ্রধানরা ভাতা পাওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন। তবে সব নারী পরিবারপ্রধান ফ্যামিলি কার্ড পেলেও ভাতা দেওয়া হবে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কোয়ান্টাইলের অন্তর্ভুক্ত যোগ্য পরিবারগুলোকে।
সোমবার থেকেই দেশের অন্যান্য এলাকার মতো কুলিয়ারচরেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ কাজে সারাদেশে ৬৬ হাজার ৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী এবং ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার নিয়োজিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তথ্য সংগ্রহকারীদের প্রশিক্ষণের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয়েছে।
তথ্য সংগ্রহকারীরা বিশেষায়িত ট্যাবলেট ডিভাইস ব্যবহার করে সরেজমিনে প্রতিটি পরিবারের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবেন। পরে এসব তথ্য সরাসরি অনলাইন ডেটাবেইসে সংরক্ষণ করা হবে। তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে সিম কার্ড সরবরাহ, নেটওয়ার্কভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা, কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার (এনওসি) স্থাপনের মতো প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে সারাদেশে আনুমানিক ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে ডেটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। পরে পিএমটি স্কোরের ভিত্তিতে সেখান থেকে যোগ্য উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে। চলতি অর্থবছরে নতুন করে ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী তিন অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে যোগ্য সব নারী পরিবারপ্রধানকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রেস কনফারেন্সে জানানো হয়, উপকারভোগীদের দেওয়া ফ্যামিলি কার্ডে ডুয়াল চিপ, কিউআর কোড ও নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন (এনএফসি) প্রযুক্তি থাকবে। কার্ডটি সরকারের টাকাপে পেমেন্ট স্কিমের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে উপকারভোগীরা ব্যাংকের এটিএম বুথ, বিপণিবিতানের পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) মাধ্যমে ভাতা উত্তোলনের সুবিধা পাবেন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহবুবা সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এড. ও সাংবাদিক মুহাম্মদ শাহ্ আলম, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী মোঃ শাহাদাৎ হোসেন শাহ আলম, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ.এইচ.এম. ইজাজুল হক, স্থানীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক এবং ছয়সূতী ইউনিয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারীরা।
প্রেস কনফারেন্স শেষে তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারীদের মধ্যে ট্যাবলেট ডিভাইস বিতরণ করা হয়।