আমাদের সময় শিক্ষক ছিলেন শিক্ষার্থীর কাছে শ্রদ্ধা, শাসন ও আদর্শের প্রতীক। ভুল করলে শিক্ষক শাসন করবেন এটাই ছিল স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য বিষয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যেন সেই চিত্র পাল্টে গেছে। এখন কোথাও কোথাও শিক্ষকের শাসনের জবাব দিতে শিক্ষার্থীই শিক্ষকের ওপর চড়াও হচ্ছে! বগুড়ার সাম্প্রতিক একটি ঘটনা সেই ভয়াবহ বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ।
বগুড়ায় বিদ্যালয় ছুটির পর মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে শরীরচর্চা শিক্ষক রায়হান ইসলামের ওপর গাছের ডাল দিয়ে হামলা চালিয়েছে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। ১২ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সামনে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় শিক্ষকের থুতনিতে আটটি সেলাই দিতে হয়েছে এবং ঘাড়েও আঘাত লেগেছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ে ওই শিক্ষার্থীকে শাসন করার জেরেই এ হামলা। ঘটনার পর তাকে বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী একজন শিক্ষককে প্রকাশ্যে হামলা করার মতো সাহস কোথা থেকে পেল? শুধু ওই শিক্ষার্থীকে দায়ী করলেই কি দায়িত্ব শেষ? তার ভেতরে শিক্ষককে আঘাত করার এই মানসিকতা তৈরি হলো কীভাবে? পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ- আমরা কি কেউ এই দায় এড়াতে পারি?
শিক্ষার্থী ভুল করলে শিক্ষক শাসন করবেন এটি শিক্ষাব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক অংশ। তবে শাসনের নামে অপমান, নির্যাতন বা শারীরিকভাবে আঘাত করাও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে শিক্ষকের কোনো আচরণে শিক্ষার্থী ক্ষুব্ধ হলে তার প্রতিকারও হতে হবে নিয়মতান্ত্রিক পথে। হাতে গাছের ডাল তুলে নিয়ে শিক্ষককে পেটানো কোনো প্রতিবাদ নয়, এটি শিক্ষাঙ্গনের শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত।
আজ একজন শিক্ষক আক্রান্ত হয়েছেন, কাল হয়তো আরেকজন হবেন। এরপর যদি শিক্ষকের শাসন করার ক্ষমতাই ভয়ে সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা ফিরবে কীভাবে? শিক্ষক যদি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শাসন করার আগে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবতে বাধ্য হন, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আমাদের সমাজে এখন অনেক ক্ষেত্রেই অধিকার শব্দটির অর্থ ভুলভাবে শেখানো হচ্ছে। অধিকার আছে, কিন্তু দায়িত্ব নেই। প্রতিবাদ আছে, কিন্তু সংযম নেই। স্বাধীনতা আছে, কিন্তু শৃঙ্খলা নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব, পরিবারে মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার প্রবণতা।
শিক্ষককে সম্মান করা মানে অন্ধভাবে সবকিছু মেনে নেওয়া নয়। শিক্ষকের অন্যায় হলে তারও জবাবদিহি থাকতে হবে। কিন্তু সেই জবাবদিহির পথ আইন ও প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায়, হাতের মুঠোয় থাকা লাঠি বা গাছের ডাল নয়। একজন শিক্ষককে শাসনের জেরে শিক্ষার্থীর হাতে মার খেতে হলে শুধু একটি বিদ্যালয় নয়, পুরো সমাজের আয়নায় নিজের মুখ দেখা দরকার। আমরা আমাদের সন্তানদের কি শেখাচ্ছি? কিভাবে শেখাচ্ছি? তারা ভুলের প্রতিবাদ করতে শিখছে, নাকি প্রতিশোধ নিতে শিখছে?
শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হতে হবে শ্রদ্ধা, দায়িত্ব, মানবিকতা ও ন্যায়বোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। শিক্ষককে নিরাপদ রাখতে হবে, আবার শিক্ষার্থীর অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যায় যে-ই করুক, তার বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় লেখা কয়েকটি অক্ষরের নাম নয়। শিক্ষা হলো মানুষ হওয়ার শিক্ষা। আর যে শিক্ষার্থী শিক্ষককে আঘাত করা নিজের অধিকারের প্রকাশ মনে করে, সেখানে প্রশ্ন শুধু একজন শিক্ষার্থীর নয়- প্রশ্ন আমাদের শিক্ষা, পরিবার ও সামাজিক মূল্যবোধেরও।
তাই এখনই ভাবতে হবে, আগে শিক্ষার্থীদের শাসন করতেন শিক্ষক, এখন শিক্ষককে শাসন করছে শিক্ষার্থী- এই উল্টো যাত্রা আমরা আর কতদূর যেতে দেব?