বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার ১নং বড়বাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের বিতর্কিত চেয়ারম্যান, উপজেলা যুবলীগের অন্যতম সদস্য ও ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সভাপতি সরদার মাসুদকে (যিনি এলাকায় ‘টেরা মাসুদ’ নামে পরিচিত) ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। গত ২৫ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে নিজ গ্রাম বড়গুনী থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে তিনি গ্রেপ্তার হন। তাঁর গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ও সন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
উত্থান ও ক্ষমতার অপব্যবহার:
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বড়গুনী গ্রামের মৃত সর্দারের ছেলে মাসুদ সর্দার একসময় ছাগল ব্যবসায়ী থেকে মাছ ব্যবসায় যুক্ত হন। পরবর্তীতে মেম্বার ও যুবলীগ নেতা হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন। এলাকার জনপ্রিয় তৎকালীন চেয়ারম্যান অহিদুজ্জামান পান্নাকে মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে হটিয়ে তিনি প্রথম দফায় বিনা ভোটে চেয়ারম্যান হন। এরপর থেকেই এলাকায় শুরু হয় তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য ও সিন্ডিকেট রাজত্ব।
২০২১ সালের দ্বিতীয় দফা ইউপি নির্বাচনেও একই কায়দায় মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়ে ভোটের আগের রাতে ব্যালট কাটা এবং কেন্দ্র দখল করে ওপেন টেবিলে নৌকায় ভোট দিতে বাধ্য করার মাধ্যমে তিনি জোরপূর্বক চেয়ারম্যান হন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নিজের পছন্দের লোকজনকে বিজয়ী করতে অনেক জনপ্রিয় প্রার্থীকে পরাজিত করার পাশাপাশি নিজের পছন্দমতো ১২ জন ইউপি সদস্য তৈরি করেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিষদ পরিচালনা ও বিভিন্ন মজুদদারি ব্যবসার মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়েন।
নির্যাতন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ:
স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে চেয়ারম্যান মাসুদ ও তাঁর অনুসারী সন্ত্রাসীদের দ্বারা স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের ওপর চরম নির্যাতন ও নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ওয়াজ মাহফিল আয়োজনের মতো পবিত্র কাজেও প্রশাসন ও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে নগ্ন হস্তক্ষেপ করা হতো। তৎকালীন সময়ে ভয়ে বহু নেতাকর্মী নিজ বাড়িতে থাকতে না পেরে ধানক্ষেত এবং বনে-জঙ্গলে লুকিয়ে থেকেও নিস্তার পাননি।
৫ আগস্টের পরও বহাল তবিয়তে প্রভাব:
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও দেশত্যাগের পরও চেয়ারম্যান মাসুদ এলাকা ছেড়ে কোথাও যাননি। টাকার জোর এবং রহস্যজনক এক অজানা শক্তির ইন্ধনে তিনি দিব্যি এলাকায় নিজের আধিপত্য বজায় রেখে চলছিলেন। সরকারের পটপরিবর্তনের পরও তাঁর ঠিকাদারি কাজে কোনো ভাটা পড়েনি; বরং স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সামনে ক্ষমতা জাহির করে তিনি দিব্যি নিজের কাজ হাসিল করে আসতেন। কার ইন্ধনে তিনি এতদিন বহাল তবিয়তে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, তা নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন চলছে।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া:
দীর্ঘ এক দশক ধরে চলা হয়রানি, অত্যাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অবসান ঘটিয়ে এই গ্রেপ্তারে এলাকাবাসী স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। বড়বাড়িয়া ইউনিয়নের সাধারণ জনতা এই গ্রেপ্তারকে স্বাগত জানিয়ে এলাকায় স্থায়ী শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে অতীতে এসব স্বৈরাচারের দোসরদের ক্ষমতার অপব্যবহার ও পুনর্বাসনে যারা সহায়তা করেছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।