স্টাফ রিপোর্টার: রাজধানীর পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (মিটফোর্ড হাসপাতাল) চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও রোগীর স্বজনদের কলাপসিবল গেট আটকে দীর্ঘসময় জিম্মি করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। জরুরী চিকিৎসা না পেয়ে সেখান থেকে পুলিশের সহযোগীতায় বের হয়ে স্বজনরা রোগীকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এমনই এক ঘটনা ঘটেছে ঈদ-উল-আযহার দ্বিতীয় দিনে। শুক্রবার (৩০ জুলাই) মিটফোর্ড হাসপাতালের জরুরী বিভাগে রোগীর স্বজনদের মারধর এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে আছড়ে ভেঙ্গে ফেলার মত গুরুতর ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। রোগীর স্বজনরা মৌখিক অভিযোগ করলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করেননি বলে জানা গেছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায় যে, রাজধানীর বংশাল থানা এলাকার লুৎফর রহমান লেনের বাসিন্দা বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী এ্যাডভোকেট মৌসুমী বেগম ও মো. শফিকুল ইসলাম দম্পতির বড় ছেলে সাইফুল ইসলাম (১৫) নিজ বাসায় বৃষ্টিভেজা টাইলসের উপর পিছলে পড়ে গেলে ডান হাতের তালু বেশ খানিকটা কেটে যায় এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এ অবস্থায় খালা ফাতেমা বেগম কবিতা (৩২) সাইফুলের হাতে গামছা পেঁচিয়ে দ্রুত তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে জরুরী বিভাগের টিকিট নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে ডাক্তার কবিতাকে টিটেনাস ইনজেকশন কিনে নিয়ে আসতে বলে। কবিতা ইনজেকশন আনতে বাইরে গেলে ইতোমধ্যে রোগী সাইফুলের বাবা-মা তাদের ছোট ছেলে লতিফ (১২) সহ হাসপাতালে চলে আসে। টিটেনাস ইনজেকশন নিয়ে সকলে ভিতরে প্রবেশ করে দেখতে পায় সাইফুল হাতে গামছা পেঁচানো অবস্থায় সেভাবেই রয়েছে। রক্তক্ষরণ বেশী হওয়ায় গামছা চুইয়ে রক্ত ঝরছে দেখে খালা কবিতা বেগম গামছার উপর তার ওড়না পেঁচিয়ে সাইফুলের হাত চেপে ধরে রাখে। অন্যদিকে সাইফুলের বাবা-মা কিছু একটা ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সেখানে কর্তব্যরতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে “টিটেনাস ইনজেকশন ১২ ঘন্টার মধ্যে দেয়া যাবে“ এই বলে তাদেরকে অপেক্ষা করতে বলেন। এ সময় আহত সাইফুলের মা এ্যাডভোকেট মৌসুমী বেগম ছেলের হাতের রক্তক্ষরণ বিষয়ে তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করছে না বলে অস্থিরতা প্রকাশ করলে সেখানের কেউ একজন তাদেরকে বের হয়ে যেতে বলে। মেঝেতে রক্ত পড়েছে বলে তাদের উপর রাগারাগিও করে। তখন চলমান এই দৃশ্য সংরক্ষণের জন্য মৌসুমী বেগম তার মুঠোফোনে ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে সেখানকার একজন মৌসুমী বেগমের হাত থেকে স্যামসাং ব্রান্ডের দামী মুঠোফোনটি কেড়ে নিয়ে তার সামনেই আছড়ে ভেঙ্গে ফেলে। এ সময় তার স্বামী শফিকুল ইসলাম বিষয়টির প্রতিবাদ করতে গেলে সেখানে থাকা কয়েকজন তাদের উপর আক্রমণ চালায়। তাদের গায়ে হাত তোলে, মারধর করে, স্যালাইন রাখার রডস্ট্যান্ড দিয়ে আঘাত করে, শফিকুল ইসলামের গায়ের পাঞ্জাবী টেনে ছিড়ে ফেলে এবং এ্যাডভোকেট মৌসুমী বেগমের হাতে থাকা ব্যাগ টানাহেচড়া করে ও তার শ্লীলতাহানীর চেষ্টা করে। এতে করে তার ব্যাগে থাকা ২০ হাজার টাকা ও গলায় থাকা চেইন লোপাট হয়ে যায়। এ সময় কেউ একজন চিৎকার করে দারোয়ানকে বলে “গেট লাগা, ওরা যেন বের হতে না পারে।” তারা এই বলে হুমকি প্রদান করে যে, “তোদেরকে আজ মেরে লাশ বানিয়ে গুম করে ফেলবো।” এ সময় তারা এক চরম ভীতিকর ও নারকীয় অবস্থার তৈরী করে বলে বিবরণে জানা যায়। এ অবস্থায় শফিকুল ইসলাম চিকিৎসা নিতে আসা তার আহত ছেলেকে নিয়ে কোনো রকমে ছুটে গিয়ে পাশের এক্স-রে রুমে ঢুকে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে আশ্রয় নেয়। পরে পুলিশের সহায়তায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে সেখান থেকে বের হয়ে তারা ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে আহত ছেলের চিকিৎসা গ্রহন করে। সেখানে ছেলের হাতে ৬ টি সেলাই পড়ে।
এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কেরানীগঞ্জের নারিকেলবাগ থেকে এক সহকর্মীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে আসা দিনমজুর মো. আবুল কাশেম এই প্রতিবেদককে বলেন, “মহিলার (মৌসুমী বেগম) বাচ্চার হাত কাইট্টা গ্যাছে, হেরাতো একটু চিল্লা-পিল্লা করবোই। হেরা ডাক্তার হিসাবে হেগো এইটা বুঝানো উচিৎ আছিলো। না বুঝাইয়া হেরা হেগো লগে রাগা-রাগী, ফালা-ফালি করছে, এহনতো দোষ দ্যাহা যায় ডাক্তারগোই।” মৌসুমী বেগমরা যেন হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যেতে না পারে, তাই ডাক্তাররা দারোয়ানকে কলাপসিবল গেট লাগিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন বলেও স্বীকারোক্তি দেন এই প্রত্যক্ষদর্শী দিনমজুর আবুল কাশেম।
সংশ্লিষ্ট ঘটনায় কথিত দুই ডাক্তার, ডা. রেজোয়ান ও ডা. তারিফের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাদেরকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে মৌসুমী বেগম আহত ছেলে এবং নিজেদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সামাল দিতে দেরি হওয়ায় ঘটনার ৩ দিন পর গতকাল সোমবার (৩ জুলাই) অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে বিচার প্রার্থনা করেছেন বলে জানিয়েছেন। এ বিষয়ে বিজ্ঞ মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতে “সি.আর. মামলা নং- ৭৬০/২৩ এবং ধারা- ৩২৩/৩২৪/৩০৭/৩৭৯/৫০৬/১০৯ দন্ডবিধি” বলে জানা যায়।