মোঃ মাইন উদ্দিন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
দীর্ঘ ১৯ বছরের প্রবাস জীবনে কষ্টার্জিত উপার্জনে গড়া নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ তুলে বিচার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের দুবাই প্রবাসী মোঃ আবু কালাম। তার দাবি, প্রায় এক কোটি টাকার সম্পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর স্ত্রী মোছাঃ তানজিনা আক্তার ১৪ বছরের সংসার ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করেছেন।
এ ঘটনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সালিশ বৈঠক ডেকেও কোনো প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি। মোঃ আবু কালাম (৪৪) কুলিয়ারচর উপজেলার ভাটি জগৎচর গ্রামের মৃত চান্দু মিয়ার ছেলে। বুধবার (১৩ মে) স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে তিনি অভিযোগ করেন, ২০০৭ সালে জীবিকার তাগিদে তিনি দুবাই যান। প্রবাসে যাওয়ার আগে পার্শ্ববর্তী জাফরাবাদ গ্রামের মোঃ মেরাজ আলী শাহ’র মেয়ে তানজিনা আক্তারের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে ২০১৩ সালের ৪ অক্টোবর পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়।
আবু কালামের ভাষ্য মতে, বিয়ের পর প্রায় এক দশক তাদের দাম্পত্য জীবন স্বাভাবিক ছিল। তবে দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়ায় বিভিন্ন সময় চিকিৎসাও করান তারা। তিনি দাবি করেন, প্রবাসে উপার্জিত অর্থ স্ত্রীর প্রতি আস্থার ভিত্তিতে তার কাছেই জমা রাখতেন। তার অভিযোগ, জাফরাবাদ মোড়ে জমি কেনার জন্য স্ত্রীকে প্রায় ২৬ লাখ টাকা পাঠান। রেজিস্ট্রি ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ আরও ৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়। জমির দলিলটি তার নামে হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা তানজিনা আক্তার নিজের নামে করেন। একই জায়গায় মাটি ভরাট ও দোকান নির্মাণের জন্য আরও প্রায় ৩০ লাখ টাকা বিভিন্ন সময়ে পাঠানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এছাড়া স্ত্রীর জন্য প্রায় ১৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার কিনে দেওয়ার কথাও জানান। তার আরও অভিযোগ, পারিবারিক প্রয়োজনে স্ত্রী তানজিনার বাবা মোঃ মেরাজ আলী শাহ ও ভাই সুজনও তার কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নিয়েছেন। প্রবাসী আবু কালাম বলেন, প্রায় এক বছর আগে হোয়াটসঅ্যাপে তিনি স্ত্রীর পাঠানো তালাকের একটি এফিডেভিটের কপি পান। পরে দেশে ফিরে জানতে পারেন, তালাকের কাগজ তৈরির আরও আগে থেকেই বিষয়টি গোপন রেখে স্ত্রী তার কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি জানতে পারেন, তার স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করেছেন এবং বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ ও বিভিন্ন সালিশ বৈঠক করেও কোনো সমাধান পাননি। সবকিছু হারিয়ে তিনি এখন নিঃস্ব বলে দাবি করেন। এ ঘটনায় তিনি রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একইসঙ্গে তার সম্পদ ও অর্থ উদ্ধার করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে আবু কালামের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তানজিনা আক্তার (৩৩)।
গত ২৩ মে বুধবার দুপুরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলো সত্য নয়। আমাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই দূরত্ব ছিল। ওর শারীরিক সমস্যার কারণে ১৪ বছরেও আমাদের সন্তান হয়নি। বারবার দেশে আসতে বললেও সে আসেনি।” তানজিনা দাবি করেন, আবু কালামের টাকায় তার নামে তিনটি জমি কিনে দেওয়া হয়েছে। তবে জাফরাবাদ মোড়ের জমিটি তিনি নিজের সঞ্চয়, স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি এবং বাবার দেওয়া অর্থ দিয়ে কিনেছেন।
তিনি আরও জানান, প্রায় এক বছর আগে তিনি ঢাকার গোলাপবাগ এলাকার সুমন নামে এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেছেন এবং বর্তমানে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তানজিনা আক্তার বলেন, “আমার বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা রয়েছে। চিকিৎসার খরচও আমার পরিবার বহন করেছে। সংসারে অবহেলা ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই আমি তালাকের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
এদিকে, ২০২৪ সালের ২৭ জুন কিশোরগঞ্জে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা একটি এফিডেভিটে তানজিনা আক্তার উল্লেখ করেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিন বনিবনা না হওয়ায় তিনি তালাকের সিদ্ধান্ত নেন। তবে তার বর্তমান বক্তব্য এবং এফিডেভিটের তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকায় বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী স্ত্রী কেবল তখনই স্বামীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা পান, যখন কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে সেই অধিকার অর্পণ করা থাকে। এছাড়া তালাক কার্যকরের জন্য স্বামী ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশ পাঠানো এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। শুধুমাত্র এফিডেভিট করলেই তালাক কার্যকর হয় না। তবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে দেওয়া তালাক এবং পরবর্তী বিয়ে কতটা বৈধ, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন আইন সংশ্লিষ্টরা।