আবু জাফর বিশ্বাস, বরিশাল ব্যুরোঃ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরিশাল–৫ সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে। বরিশাল সদর ও আশপাশের ১০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত থাকলেও এবার ভোটের মাঠে তৈরি হয়েছে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক দল, বাম ও বিকল্প ধারার প্রার্থীদের সক্রিয় উপস্থিতি নির্বাচনী সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নগর ও গ্রামীণ ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত এই আসনটি কেবল বরিশালের নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এখানকার ফলাফল আগামী দিনের রাজনৈতিক প্রবণতার ইঙ্গিত দিতে পারে।
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও দলীয় মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, “বরিশাল–৫ আমার রাজনৈতিক জীবনের আবেগ ও দায়িত্বের জায়গা।
জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়াই আমাদের লক্ষ্য।” তিনি জানান, নির্বাচিত হলে নাগরিক সেবা, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেবেন।
জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতারা দাবি করছেন, ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ সব অঙ্গসংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে কাজ করছে।
নির্বাচনী ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস এই আসনে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে উপ-নির্বাচনে প্রথমবার অ্যাডভোকেট সরোয়ার বিজয়ী হন এবং ১৯৯৮, ২০০১ ও ২০০৮ সালেও জয় ধরে রাখেন। যদিও ২০০৮ সালে মাত্র ছয় হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা স্পষ্ট হয়।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দিক থেকেও আসনটি এবার গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির ও প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বলেন, আমরা ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করি। দলটির নেতারা জানান, চরমোনাই প্রভাবিত এলাকায় তাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল বলেন, আমরা দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চাই। দলটির দাবি, তরুণ ভোটারদের মধ্যে নৈতিক রাজনীতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
বামপন্থী রাজনীতিতে বাসদের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন,এই নির্বাচন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই। অন্যদিকে এনসিপির প্রার্থী নুরুল হুদা মিলু চৌধুরী সুশাসন ও স্বচ্ছতার কথা বলেন। গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী দেওয়ান আবদুর রশিদ নীলু বলেন, এটি ক্ষমতার পালাবদলের নয়, বরং রাজনীতির ধরণ বদলের নির্বাচন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামি আন্দোলনের একটি সংগঠিত ভোটব্যাংক তৈরি হয়েছে — ২০০৮ সালে তারা ১১.৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল এবং ২০১৮ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩৩ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছে।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, জামায়াত ও বিকল্প ধারার সক্রিয়তা মিলিয়ে বরিশাল–৫ আসনের ফলাফল এবার অনিশ্চিত। ফলে এই আসনটি জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ভোটারদের আগ্রহ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা ততই বাড়ছে। বরিশাল–৫ আসনের লড়াই তাই শুধু একটি আসনের ফল নয় — এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।